প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বন্যার কারণে ১৬ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপন্ন

মো. তৌহিদ এলাহী : চলমান বর্ষা মৌসুমে দেশের অনেক স্থান প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। কয়েকটি জেলায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক সড়কে খানাখন্দ ও মাটি ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। কিছু স্থানে সেতুও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ১৬টি জেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় সেখানেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। জরুরি অবস্থায় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের জোনভিত্তিক সমন্বয় ও মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। ১৬ জেলায় বিশেষ মনিটরিং, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিজ দপ্তরে অবস্থান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু থাকবে, যেখানে বিপর্যয়মূলক পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভা শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম।

সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, অতি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে দেশের ১৬টি জেলায় বন্যার জন্য মহাসড়ক নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মুখে রয়েছে। এতে ১৬টি জেলার নাম সুনির্দিষ্ট করা না হলেও বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের আওতায় খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং কেরানীহাট-বান্দরবান জাতীয় মহাসড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে আছে। জামালপুর-সুনামগঞ্জ, নেয়ামতপুর-তাহেরপুর, কচিরঘাট-বিশ্বম্ভরপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং সিলেট-মৌলভীবাজারের তিন থেকে চার অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের ৫৮তম কিলোমিটারের কলাবাগান নামের একটি স্থানে মাটি ধসে যোগাযোগ বন্ধের পথে। সিলেট মহাসড়কের ১১তম কিলোমিটারে সিমেন্টবাহী একটি ট্রাক নিয়ে বেইলি ব্রিজ ভেঙে পড়েছে। শ্যামপুর-দুর্গাপুর মহাসড়কের একটি স্থানে কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কার মুখে রয়েছে। রংপুর-কুড়িগ্রাম অংশে কাউনিয়ার কাছাকাছি ২০০ মিটার অংশে ভারী যান চলাচলের জন্য প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পঞ্চগড় শহর এলাকায় করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুর এক পাশের এক্সপানশন জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যশোর-খুলনা মহাসড়ক নির্মাণাধীন থাকা অবস্থায়ও নানা ত্রুটি রয়েছে।

নেত্রকোনার ১০ উপজেলার মধ্যে সাতটির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলেও কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্টার রাস্তাঘাট পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কলমাকান্দা উপজেলায় এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন বলেন, এ উপজেলায় ১৩টি গ্রামীণ সড়কে ৩৮ কিলোমিটার রাস্তা ডুবেছে। জামালপুরে বন্যায় রেললাইনে পানি ওঠায় বন্ধ হয়ে গেছে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল। বন্যায় জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও বকশীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা নায়েব আলী জানান, বন্যার পানিতে ২১.৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক আংশিক ও ৭.৭৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। শেরপুর জেলা সদর, নকলা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে কাঁচা-পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত ৬ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টিতে রাঙ্গামাটির সবগুলো সড়ক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক ও রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কের একাধিক স্থানে ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক ও রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কে ভারী যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৫১টি স্থানে সড়কধসের ঘটনা ঘটেছে। বান্দরবানে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা ভেঙে বন্ধ রয়েছে জেলা সদরের সঙ্গে রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি উপজেলার যান চলাচল। বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের বাজালিয়ায় পানি জমে থাকায় নয় দিন ধরে জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমেদ জানান, গত এক সপ্তাহে জেলার ৩৬টি জায়গায় প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামে ১৫ উপজেলার সবগুলোতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী-রাঙ্গামাটি, কেরানীহাট-বান্দরবান, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম-রাঙ্গুনিয়া-রাউজান, চট্টগ্রাম-আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া সড়কে বিভিন্ন আকারের গর্তে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামে নয় উপজেলার ৬০টি ইউনিয়নের সঙ্গে জেলা কিংবা উপজেলার কাঁচা-পাকা সড়ক যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ওইসব এলাকার লোকজন জরুরি প্রয়োজনে কোমর পানি ভেঙে থানা কিংবা জেলা সদরে যাচ্ছেন। রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপংকর রায় জানান, উপজেলার ৯০ শতাংশ এখন পানির নিচে। জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, তাদের হিসাবে জেলায় এ পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার কাঁচা ও ১৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হওয়ায় এগুলোর গ্রামীণ রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আমিরুজ্জামান জানান, এবারের বন্যায় গ্রামীণ রাস্তাঘাটের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা নিরূপণে কাজ চলছে। গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলায় কয়েকশ কিলোমিটার কাঁচা ও পাকা রাস্তা তলিয়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় আরও তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে কয়েকশ কিলোমিটার কাঁচা ও পাকা সড়ক।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি এবং জলঢাকার শৌলমারী ইউনিয়নের প্রায় ৩৭ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বিধ্বস্ত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান চাঁন জানান, গত রবিবার থেকে যমুনা নদীর পানির স্রোত বাড়তে থাকায় নাটুয়ারপাড়া-খাসরাজবাড়ি সড়কে ধস দেখা দেয়। গত মঙ্গলবার বাঁধটির ২৫০ মিটার ধসে যায়। ফলে এ দুটির এলাকার মানুষের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সম্প্রতি অতি বর্ষণ ও বন্যার ফলে দেশের যেসব সড়কে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে আমরা দ্রুততার সঙ্গে মেরামতসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এছাড়া সারা দেশে সড়কের সার্বিক দিক দেখভালের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিম কাজ শুরু করেছে। তারা আগামী শুক্র ও শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনের মাধ্যমে সার্বিক চিত্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। আমরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যা যা করা দরকার সব ধরনের ব্যবস্থাই করব।’

সভা সূত্রে জানা যায়, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, কুমিল্লা, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ এলাকার সড়কগুলোর বিষয়েও মনিটরিং টিম কাজ শুরু করেছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে মহাসড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচল বাড়বে। তাই মহাসড়কের নেটওয়ার্কিং বাড়ানোর জন্য এখনই কাজ শুরু করার ওপর জোর দেয়া হয়। মনিটরিং টিমের কর্মকর্তারা যেকোনো বিপর্যয়মূলক পরিস্থিতির তথ্য নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করবে। গণমাধ্যমে এ ধরনের তথ্য প্রকাশ হওয়ার আগেই মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে। বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেসব সড়ক প্রায়ই ডুবে যায়, তা অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে রাস্তা উঁচু করার ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের (গেজেটেড সংস্থাপন শাখা) উপসচিব নজরুল ইসলাম সরকার স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশও জারি করা হয়। এ আদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘মঙ্গলবার আমরা একটি অফিস আদেশ জারি করেছি। সেখানে চলমান বর্ষা মৌসুমে বিরাজমান বন্যা পরিস্থিতিতে মহাসড়ক পথে জনসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত