প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশ বিদ্রোহ আর ভালোবাসার দেশ, ভক্তির দেশ নয়

ফারুক ওয়াসিফ : আলোকিত শুনলেই ইংরেজ দখলদারদের কথা মনে পড়ে। শুষে ছিবড়া করা দেশটাকে তারা উপহার দিয়েছিলো আলোকিত মানুষ তৈরির আলোকায়ন কারখানা ও একটা সাহেবি বিশ্বসাহিত্য। কলকাতায় যখন ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো শুরু হয় তখন ব্রিটেনে এই নামে কোনো বিদ্যাবিভাগ ছিলো না। আর যে দেশে একবার এই কারখানা বসেছে সেদেশে কোনোদিন বিপ্লব হয়নি। ফরাসি-স্প্যানিশ-ওলন্দাজ কলোনিতে বিপ্লব হলেও কোনো ইংরেজ কলোনিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তনকামী সামাজিক বিপ্লব ঘটেনি। এমনকি স্বদেশী ভাষা ও সাহিত্যের বিউপনিবেশায়ন ঘটতে পারেনি।

মূলত কৃষক ন্যাটিভদের ঘৃণা করা ছাড়া এই আলোকিত মানুষ তৈরি হওয়ার নজির নেই। সিপাহী বিপ্লবের সময় এই আলোকিতরা পত্রিকায় আর্তনাদ ছাপাতেন যে, ইংরেজের বন্দুকের গুলি কি ফুরিয়ে গেছে? সাঁওতাল বিদ্রোহসহ সব কৃষক বিদ্রোহের সময় অধিকাংশ আলোকপ্রাপ্তরা আতঙ্কিত হতেন। অথচ এসব চাষিদের শ্রমেই তারা জমিদার বাবু কিংবা ইত্যাদি হতে পারেন। হয়ে গেলে ‘চাষা’ শব্দটাকে গালি হিসেবে ব্যবহারে এদের প্রভূত সুখ হয়। এদের এক অদ্ভুত খায়েশ, সাহেবেরা যেন তাদের গরিব-গুর্বাদের সঙ্গে এক করে না দেখেন। তারা আলাদা, উন্নত, রুচিশীল। নিজেদের সুশীল বলে সাংস্কৃতিক ব্রাহ্মণ্যবাদের অহংপূজা করতে এদের লজ্জাও লাগে না। কৃষ্টি কথাটার মধ্যে কৃষির ছাপ আছে বলে এরা নতুন শব্দ বানালেন সংস্কৃতি। এদের প্রিজুডিস বা সংস্কার সংস্কৃতি কথাটার মধ্যে আছে, যেমন আছে নিজেদের জনগণের চাইতে উন্নত বা সংস্কৃত বলে সুখ পাওয়ার অভিলাষ। এরা হেজিমনিক নয়, এরা ডমিন্যান্ট। গণবিরোধী ক্ষমতার আশপাশেই এদের কারবার, বিদেশ এদের পরকীয় সংসার।

ব্রিটিশ এলিট কিন্তু তার দেশের কৃষক-শ্রমিককে চাকর বা নিচুজাত ভাবে না। কিন্তু ব্রিটিশ প্রভুর পয়দা এরা জনগণ থেকে দূরত্ব মেপে নিজেদের সভ্য ও সুজন থাকতে চায়। আমরা কেবল পশ্চিমা কলোনিয়ালিজমেরই শিকার না, আমরা এসব আলোকিতদের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের দ্বারাও নিষ্পেষিত।

আশার কথা, গত এক দশকে এসব এলিটেরা পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকের টাকায় চালানো কৃষি, খামার, ছোট ব্যবসা করে উঠে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি শহরগুলো ভরে আছে। নুরু কিংবা রাশেদরা এদেরই সন্তান হয়ে ঢাবি কাঁপায়। অন্যদিকে গণবিরোধিতার রেকর্ড গড়তে গড়তে এসব আলোকিত বুদ্ধিজীবীদের অতিকায় ভাব আপন মূর্তিটাসহ একের পর এক ধরাশায়ী হয়। ছোটলোকদের এই গতিশীলতা এবং লুটেরা বড়লোকদের কাছে বন্ধকী মনের কারণে এসব আলোকিত এলিটদের দিনকে দিন অবান্তর ও হাস্যকর হয়ে পড়া তাই একদিক থেকে ভালো। শাসক ও সুবিধাবাদীরা যখন ভুল করে, তখন আশাবাদী হওয়াই যায়।

বাংলাদেশ বিদ্রোহ আর ভালোবাসার দেশ, ভক্তির দেশ নয়। ভক্তিবাদীদের এই পতন তাই প্রগতিশীল ঘটনা। প্রবাসী শ্রমিক ও কৃষকের সন্তানেরা যে পড়ালেখা করে এলিটদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারছেন সেটাও এই দুর্দিনে স্বাস্থ্যকর ঘটনা বৈকি। আমি এক মহান আলোকিতর গল্প জানি, যিনি ওসমানী উদ্যান আন্দোলনের সময় মশার বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দিয়ে ইস্যু দিয়ে ইস্যু ঢাকার চেষ্টা করেছেন। সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের সময়ে আগডুম-বাগডুম করে বেড়িয়েছেন। এদের কারখানা থেকে কোনো বড় চিন্তুক বা বুদ্ধিজীবী তৈরি হবার উদাহরণ নেই। গরিব ও চাষাদের নিয়ে পরিহাস করতেই শুধু এরা পারে, আর শ্রমিক ও চাষারা জানে দেশ তাদের একটিই এবং দেশ কারো বাপের নয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত