প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঈদের আগে চাঙ্গা পুঁজিবাজার

ডেস্ক রিপোর্ট  : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের সরকারের ওপর আস্থা রাখতে বলেছিলেন। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পুঁজিবাজারের ইনডেক্স (সূচক) কত হবে, তা আমি বলব না। ইনডেক্স ঠিক করে দেবে অর্থনীতি। তবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে সরকারের প্রতি আপনারা বিশ্বাস রাখুন। আমরা ঠকব না, এখান থেকে আমরা জিতব। পুজিবাজারের সফলতা আসবেই।’ পাশাপাশি আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। নিয়েছেন পুঁজিবাজারবান্ধব উদ্যোগ। কিন্তু তাতেও যেন আস্থা ফিরছিলোনা পুঁজিবাজারে। অবশেষে ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থমন্ত্রীর কথার কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে। চাঙ্গা হয়েছে পুঁজিবাজার।

ঈদের আগে শেষ কার্যদিবস গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের শেয়ারবাজারে মূল্য সূচকের বড় উত্থান হয়েছে। এ নিয়ে টানা তিন কার্যদিবস শেয়ারবাজারে বড় উত্থানের দেখা মিললো। ধুঁকতে থাকা শেয়ারবাজারে ঈদের আগে এমন চাঙাভাব ফিরে আসায় কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলেছে বিনিয়োগকারীদের। এর আগেও গত সপ্তাহেও কিছুটা চাঙ্গা ছিল পুঁজিবাজার।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর আবু আহমেদ জানান, সরকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য ফান্ড দিয়েছে। ফলে আশার সঞ্চার হয়েছে পুঁজিবাজারে।

সূত্র মতে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ২ থেকে ৮ জুন শেয়ারবাজারে লেনদেন বন্ধ থাকবে। আর ৩১ মে ও ১ জুন সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় এ দুই দিনও লেনদেন বন্ধ থাকবে। ফলে ঈদের আগে গতকালই ছিল শেয়ারবাজারের লেনদেনের শেষ কর্যদিবস। টানা নয় দিন বন্ধ থাকার পর আগামী নয় জুন থেকে আবার লেনদেন শুরু হবে।

ঈদের আগের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে মূল্য সূচকের বড় উত্থান দেখা যায়। দিনের লেনদেন ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ২৩ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ হাজার ৩৭৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানো, আইপিও এবং প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধ, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ এবং ঈদ কেন্দ্রীক শেয়ার বিক্রির চাপ কমে আসায় বাজারে চাঙাভাব ফিরে এসেছে। স¤প্রতি যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে সামনে বাজার আরও ভালো হবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়শনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, রোজার মাঝামাঝিতে ঈদের খরচের জন্য শেয়ার বিক্রির এক ধরনের চাপ ছিল। শেষ সময়ে এসে ঈদ কেন্দ্রীক শেয়ার বিক্রির সেই চাপ কমেছে। শেয়ার বিক্রির চাপ কমায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাছাড়া স¤প্রতি বিভিন্ন সংস্কার ও নীতি-সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাজেটেও বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হবে বলে দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। আশা করছি শেয়ারবাজারে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রধান মূল্য সূচকের মতো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অপর দুটি মূল্য সূচকও ঊর্ধ্বমুখীতার দেখা পেয়েছে। এর মধ্যে ডিএসইর-৩০ সূচক আট পয়েন্ট বেড়ে এক হাজার ৮৭৬ পয়েন্টে উঠে এসেছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক দুই পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২১৪ পয়েন্টে।

মূল্য সূচকের পাশাপাশি বেড়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৮০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ১১৫টির আর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫০টির দাম।

বিনিয়োগকারী এহেতেশামুজ্জামান বলেন, কয়েক মাস ধরেই শেয়ারবাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে। ঈদের আগে গত কয়েকদিন কিছুটা ঊর্ধ্বমুখীতার দেখা মিলেছে। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে বাজারে। কিন্তু ঈদের পর বাজার কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন পক্ষ থেকে শোনা যাচ্ছে বাজেটের পর বাজার ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন সেই আশা নিয়েই ঈদ করতে গ্রামে যাবো।

আব্দুর রহিম নামের আর এক বিনিয়োগকারী বলেন, দীর্ঘদিন বাজার খারাপ। গত কয়েক দিনের উত্থানে লোকসান কিছুটা কমলেও, পুরোপুরি লোকসান কাটেনি। ঈদের পর কিছুদিন বাজার এমন ভালো থাকলে লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবো বলে আশা করছি।

এদিকে মূল্য সূচকের উত্থানের পাশাপাশি ডিএসইতে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকার। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে লেনদেন বেড়েছে ৯২ কোটি তিন লাখ টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সিএসইসি) ক্যাপিটাল ইস্যু রুলস, ২০১৫ সংশোধন করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মো. রকিবুর রহমান। তিনি বলেছেন, আইনটি সংশোধনে বিএসইসি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত বুধবার বিএসইসি তার ৬৮৮তম কমিশন সভায় ক্যাপিটাল ইস্যু রুলস, ২০১৫ সংশোধনসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশোধনীর বিষেয় মো. রকিবুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারী ও বাজারের স্বার্থে আমরা ডিএসই’র পক্ষ থেকে স¤প্রতি বিএসইসির কাছে যেসব প্রস্তাব ও সুপারিশ দিয়েছিলাম, তার বেশির ভাগই সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তসমূহে প্রতিফলিত হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও বাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে।

আইপিও সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে আছে-এখন থেকে অভিহিত মূল্যের আইপিও’র ক্ষেত্রে ন্যুনতম আকার হতে হবে ৫০ কোটি টাকা অথবা কোম্পানির আইপিও পূর্ববর্তী পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ, বুকবিল্ডিং পদ্ধতির আইপিও’র ক্ষেত্রে আইপিও’র ন্যূনতম আকার হতে হবে ১০০ কোটি টাকা অথবা কোম্পানির আইপিও প‚র্ববর্তী পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ, আইপিওতে যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে কোটা সুবিধা পেতে চাইলে সেকেন্ডোরি মার্কেটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থাকতে হবে, নিলামে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা যে দামে যে সংখ্যক শেয়ার কেনার আগ্রহ প্রকাশ করবে, তাদেরকে সেই দামে উল্লিখিত সংখ্যক শেয়ার কিনতে হবে, নিলামে সর্বোচ্চ দাম থেকে শেয়ার বিক্রি করা শুরু হবে। যে দামে এসে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটার শেয়ার বিক্রি শেষ হবে, সেটি হবে কাট-অফ প্রাইস। এই মূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশ কম মূল্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব করতে হবে, অভিহিত মূল্যের আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা হবে ৫০ শতাংশ এবং যোগ্য বিনিয়োগকারীদের ৩০ শতাংশ। বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা হবে যথাক্রমে ৪০ ও ৫০ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীর নতুন কোটার পরিমাণ আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি এবং যোগ্য বিনিয়োগকারীর কোটা আগের চেয়ে ১০ শতাংশ কম, কোম্পানির উদ্যোক্তা ও প্লেসমেন্টহোল্ডারদের শেয়ারের উপর তিন বছরের লক-ইন থাকবে, যা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার লেনদেনের দিন থেকে গণনা করা হবে।

ক্যাপিটাল ইস্যু রুলসের এসব সংশোধনীর ফলে বাজারে দুর্বল মৌলের আইপিও আসার প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে, বুকবিল্ডিং পদ্ধতির নিলামে অসাধু যোগ্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ বন্ধ হবে বলে মনে করেন মো. রকিবুর রহমান।

সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, স¤প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রণোদনা স্কিমের ৮৬৫ কোটি টাকা আইসিবির মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা হয়তো মনে করছেন তাদের সুবিধা হবে। এজন্য তারা বিনিয়োগ করছেন। এ কারণে বাজারে সূচক বাড়ছে।

তবে মাঝেমধ্যে প্রণোদনা দিয়ে বাজার বেশিক্ষণ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব না। এর জন্য দরকার ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা। একই সঙ্গে বাজারে সুপারভিশন নিশ্চিত করা- আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ কী সেটাও বলেন বিএসইসি’র সাবেক এই চেয়ারম্যান।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত