প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রীলঙ্কায় কেন জঙ্গি হামলা, আমরা নিরাপদ তো ?

বিভুরঞ্জন সরকার : ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) তবে তারা তাদের দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ না দেয়ায় সন্দেহ প্রকাশের সুযোগ তৈর হয়েছে। আইএস তাদের মূল ঘাঁটি থেকে এখন উৎখাত, বিতাড়িত। তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। কিন্তু যে দেশে দেশে ইসলামি জেহাদি সমর্থক তৈরি করতে পেরেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আইএসে যোগ দিতে অনেক দেশ থেকেই মুসলিম তরুণ-তরুণী সিরিয়া গিয়েছে। তাছাড়াও আইএসের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দেশে দেশে থাকাটাই স্বাভাবিক। শ্রীলঙ্কার জঙ্গি হামলার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আইএসের জড়িত থাকাটাই স্বাভাবিক। কাজটি হয়তো শ্রীলঙ্কার উগ্রবাদী সংগঠন ন্যাশনাল তওহিদ জামাতের (এনটিজে) সদস্যরাই প্রত্যক্ষভাবে করেছে কিন্তু তাদের সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

শ্রীলঙ্কার পুলিশ দাবি করেছে যে আত্মঘাতী সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা গেছে। মোট নয়জন ওই হামলায় অংশ নিয়েছে। তার মধ্যে আটজন পুরুষ এবং একজন নারী। এরা উচ্চ শিক্ষিত এবং ধনী পরিবারের সন্তান। একজন লেখাপড়া করেছে বৃটেনে। এরা আকস্মিকভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে এবং হঠাৎ করে একটি অভিযান পরিচালনা করেছে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। হামলার ধরন দেখে মনে করা করা হচ্ছে, এটা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফল। শ্রীলঙ্কায় যে এমন একটি মুসলিম চরমপন্থি সংগঠন গড়ে উঠছে সেটা শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষের অজানা ছিলো না। ঘটনার পর একটি আস্তানায় পুলিশের হানা দেয়া এবং অতি দ্রুত সন্দেহভাজন অনেককে গ্রেফতার করা থেকেই বোঝা যায় যে তারা নজরদারির মধ্যেই ছিলো। শ্রীলঙ্কা এমনিতে একটি শান্তিপ্রিয় দেশ। গৃহযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে দেশটি যখন স্থিতি ও সমৃদ্ধির দিকে যাত্রা আরম্ভ করেছে, তখন এই সন্ত্রাসী হামলার কারণে শ্রীলঙ্কায় আবার কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সেখানে ক্ষমতার রাজনৈতিক পরিম-লে কিছুটা দ্বন্দ্ব-বিরোধ আছে। প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিরোধ আছে। সন্ত্রাসীরা এই বিরোধের সুযোগ গ্রহণ করে থাকতে পারে। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টানাপড়েন থাকলে সেখানে উৎপাত করা সহজ হয়। যারা জঙ্গিবাদী, সন্ত্রাসী তারা সাধারণত ব্যাপক জনসমর্থন পায় না। তারা কাজ করে গোপনে, নিভৃতে। যেখানে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা কম থাকে, যেখানে সামাজিক অস্থিরতা কম সেখানে সন্ত্রাসীরা ডেরা বাধতে পারে। শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিরা সংগঠিত হয়েছে সেখানকার আপাত শান্ত পরিবেশের কারণেই কিনা সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। তবে যাই হয়ে থাক না কেন, এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে, সন্ত্রাস দমনে শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ফাঁকে মতলববাজরা যেন ফায়দা লুটতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। শাসক মহল সেখানে ঐক্যের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে কিনা, দেখার বিষয় সেটা।

শ্রীলঙ্কায় নানা ধর্মবিশ্বাসী মানুষের বাস। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। খৃস্টান, হিন্দু এবং মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। আট দশ বারো শতাংশের মধ্যে।। শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়েছে। কিন্তু সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাবের কথা তখন শোনা যায়নি। শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার হার অনেক বেশি। প্রায় শতভাগ মানুষ শিক্ষিত। শিক্ষার হার বেশি হওয়ার কারণেই হয়তো সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঘাটতি দেখা যায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানকার পরিস্থিতিও বদলাতে শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধদের মধ্যেও সহিংসতার মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটা বিভিন্ন দেশে মুসলিম উগ্রবাদের বিস্তারের কারণে, নাকি অন্য কোনো কারণে সেটা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
তবে ২১ এপ্রিলের সন্ত্রাসী হামলার পর শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের জীবন অনিরাপদ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।। যেহেতু ঘটনা সংগঠিত হয়েছে মুসলমান চরমপন্থিদের দ্বারা সেহেতু সেখানে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়তে পারে, মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে।

শ্রীলঙ্কার ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেই নিউজিল্যান্ডেও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে।। নিউজিল্যান্ডে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা চালায় একজন অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত খৃস্টান ধর্মাবলম্বী। নিউজিল্যান্ডের ঘটনাটি সন্ত্রাসী তৎপরতায় নতুন মাত্রা আনে। এতোদিন সন্ত্রাসের সঙ্গে প্রধানত মুসলমানদের নাম শোনা গেছে। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা চালিয়ে ৫০ জন নির্দোষ মানুষকে হত্যার পর সন্ত্রাসের জন্য কেবল মুসলমানদের অভিযুক্ত করা যে যথাযথ নয় সেটা বলার সুযোগ ও প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে যে বড় ধরনের একটি অস্বস্তি ছিলো তা-কিছুটা কাটতে শুরু করেছিলো। এটা বলা হচ্ছিলো যে, না, কেবল মুসলমানরাই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত নয়। অন্য ধর্ম বিশ্বাসীরাও এর থেকে বাইরে নয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ঘটনা আবার পরিস্থিতি পালটে দিলো।
শ্রীলঙ্কার ঘটনায় যদি আইএসের সংশ্লিষ্টতা না-ও থাকে তাহলেও সেটা যারা করেছে তারা যে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তা এখন আর অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কারণ হামলাকারীদের সবার নাম-পরিচয় জানা গেছে। শ্রীলঙ্কার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউজিল্যান্ডের ঘটনার বদলা নিতেই শ্রীলঙ্কায় হামলা হয়েছে। এটা হতে পারে, না-ও হতে পারে। মাত্র ৩৫ দিনের প্রস্তুতিতে এতোবড় অপারেশন পরিচালনা সম্ভব কিনা সেটাও ভাববার বিষয়। শ্রীলঙ্কায় উগ্রবাদীরা আগে থেকেই সন্তর্পণে সংগঠিত হচ্ছিলো, সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো নাশকতার। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলার ঘটনা হয়তো তাদের অভিযানের সময়কালকে ত্বরান্বিত করেছে। এই হামলার ঘটনা থেকে যে বিষয়টি আবারো সামনে আসছে, তা হলো পৃথিবীর কোনো দেশই আর নিরাপদ নয়। কোনো দেশই ঝুঁকিমুক্ত নয়। সন্ত্রাসীরা কোন দেশে কীভাবে তৈরি হচ্ছে তা আগে থেকে জানা যাচ্ছে না। তাই সব দেশকেই এখন সতর্ক থাকতে হবে। নাগরিকদের গতিবিধি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।

বাংলাদেশও আশঙ্কামুক্ত নয়। আমাদের এখানে জঙ্গিদের উপস্থিতি তারা একাধিকবার জানান দিয়েছে। জঙ্গি হামলায় আমাদের দেশেও অনেকের জীবন গেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে জঙ্গিবিরোধী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করায় এবং বেশ কয়েকটি সফল অভিযানের কারণে অনেক জঙ্গি নিহত ও গ্রেফতার হওয়ার পর এখন জঙ্গিরা বড় কোনো অঘটনের সক্ষমতা হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জঙ্গিরা দৃশ্যমান নেই মানে অবশ্য এটা নয় যে তারা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। তারা আছে এবং তাদের সঙ্গে নানা অপশক্তির যোগসাজশও হয়তো আছে। অন্যদেশে যখনই কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে তখন আমাদের দেশের জঙ্গিরা সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে। তেমন অবস্থা যাতে তৈরি না হয় সেটা দেখতে হবে সরকারকে।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত