প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিতর্কের বৃত্তে ‘শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ’

ফারুক সুমন : ১. সমসাময়িক কবি হিসেবে শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদÑ এই দুই কবিকে একধরনের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়েছেন তাদের উত্তর প্রজন্মের কবিকুল। কবি হিসেবে কে কার চেয়ে কতো বড় এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিতে যতোটা সরব ও সোচ্চার দেখা যায়, বোধকরি স্বতন্ত্র কবি হিসেবে এই দুই কবির পৃথক মূল্যায়নে ততোটা নয়। অথচ কাব্যভাষা কিংবা কাব্যস্বরের বিবেচনায় দুজনই নিজ নিজ কাব্য-সৌন্দর্যে উজ্জ্বল।
মূলত রাজনৈতিক আনুকূল্যে থাকাকে কেন্দ্র করে এই দুই কবিকে দুই সামিয়ানার নিচে দাঁড় করানো হয়েছে। কবি হিসেবে তাদের সফলতাও নির্ণয় করা হয় এই রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে। অথচ কে না জানে, কবিতাকে রাজনীতিকরণ কিংবা দলীয়করণের আওতায় নিয়ে সুচিহ্নিত করার প্রয়াস মোটেও শোভনীয় নয়। এতে কবিতার নগ্ন দিকটি প্রকাশ পায়। কবিতাকে সার্বজনীন করতে গেলে প্রয়োজন কবিকে একার ইচ্ছায় একলা পথের সারণিক হওয়া। শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদ দুজনই এই জায়গায় বেখেয়ালি তবে? তা না হলে দুজনকে নিয়ে এমন পরিস্থিতির অবতারণা হয়তো হতো না। এক্ষেত্রে মূল কারণ এবং বিবেচনার বিষয় বোধকরি আদর্শগত অবস্থান। বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক মতাদর্শ দুই কবিকে দুই মেরুতে নিয়েছে। একজন সৃজনশীল মানুষকে হতে হয় শিরদাঁড়া সম্পন্ন। তবেই তার লেখায় মানবতার কথা উচ্চকিত হয় স্ফূর্তি নিয়ে। যদি ব্যক্তি এবং সৃষ্টির মাঝে বৈপরীত্য থাকে তবে কবি কিংবা শিল্পীর সৃষ্টি মেকি, অবস্থাভেদে কৃত্রিমতায় পর্যবসিত হয়।
২. শামসুর রাহমানের কবিতা মানেই নাগরিক জীবনের কথকতা, নগরজীবনের নিঁখুত সন্ধান। নগরজীবনের সুনিপুণ ছবি তার কবিতার উপমা, চিত্রকল্প কিংবা রূপকে দৃশ্যমান। নাগরিক কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও তার কবিতা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের অনুগামী। সমাজ ও সংস্কৃতির বিবিধ উপলক্ষ কিংবা অনুষঙ্গ কবিতার বিষয় ও উপাদানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দেদীপ্যমান। সমকাল ও রাজনীতি সচেতন কবি বলেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির নেপথ্যের ইতিহাস তার কাব্যভাষায় প্রাণ পেয়েছে। স্বদেশের নানা দুর্দিনে তার কবিকণ্ঠ কবিতায় যেভাবে উচ্চকিত হয়েছে, সমকালে তেমনটি অন্য কবিদের কবিতায় কমই চোখে পড়ে। দেশ ও দশের কথা বলতে গিয়ে তার কবিতা কখনো স্লোগানধর্মী হয়েছে বৈকি।
পক্ষান্তরে, আল মাহমুদের কবিতায় উৎকীর্ণ হয়েছে লোকজ অনুষঙ্গের নানা ভাঁজ ও বৈচিত্র্য। খুব কৌশলে লোকজ শব্দের পরিশীলিত রূপ কবিতার ভাষায় ব্যবহারে তিনি বেশ পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। কবি হিসেবে তার মনোভঙ্গি প্রকৃতির নিকটবর্তী। একথা বললে অত্যুক্ত হবে পল্লী কবি জসীম উদদীনের কাব্য ধারার অনুগামী হয়ে আল মাহমুদ গ্রাম-বাংলার লোকাচারকে দিয়েছেন আধুনিক কবিতার অবয়ব। ফলে বাংলা কবিতার নিজস্ব বিষয় ও স্বরের স্ফূর্তির গুণে আল মাহমুদের কবিতা হবে কালোত্তীর্ণ।
৩. রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাওয়া কিংবা নেওয়া দোষের কিছু নয়। পূর্বেও এ ধরনের দৃষ্টান্ত ছিলো। ইতিহাসে ‘রাজসভাকবি’ হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, শিল্পচর্চার সমান্তরালে দুজন কবিই সফল হয়েছেন মতাদর্শ কেন্দ্রিক বিতর্কের বিস্তার ঘটাতে। দুজন কবিই রেখে যেতে সক্ষম হয়েছেন স্ব-স্ব সাগরেদ। যারা তাদের দুজনকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাবতীয় উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। ব্যক্তিগত বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, রাহমান-মাহমুদ দুজন দুজনকে সম্মান করেন। কখনো কখনো তারা আড্ডামুখর দিন অতিবাহিত করেছেন। বাস্তবিক অর্থে দুজনেই সমকালে কাব্যহিংসায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ধরনের কাব্যহিংসা দোষের কিছু নয়। এতে বরং শিল্প সৃষ্টির পালে হাওয়া লাগে। ইতিহাস বলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়েও তো বাজারে কম গল্প প্রচলিত নেই। স্কুলে পড়াকালীন জনৈক বাংলা শিক্ষক নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের নানা ষড়যন্ত্রের কথা বলে ক্লাসের লেকচার শুরু করতেন। এও বলতেন, নজরুল বোবা হওয়ার পেছনে রবীন্দ্রনাথের হাত আছে। নজরুল যেন বেশি লিখতে না পারেন সে জন্য ষড়যন্ত্র করে তাকে বোবা বানানো হয়েছে। নজরুল গরিব ঘরের ছেলে বলে তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথ জমিদার বংশের ছেলে বলে ক্ষমতা দেখিয়ে নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছেন। এমনতর হাস্যকর গল্প কিন্তু এখনো প্রচলিত। এভাবেই একজনকে মহান করতে গিয়ে অন্যজনকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে বানানো গল্পের স্তূপে। পরিশেষে সৃষ্টিই সত্য। যথার্থ সৃষ্টিই কীর্তির তিলক হয়ে শোভা পায় ব্যক্তির ললাটে।
৪. এবারে খোঁজ নিয়ে দেখা যাক দুজনের ব্যক্তিগত বিভিন্ন লেখা কিংবা সাক্ষাৎকারের ভাষ্য। যেখানে বিতর্কের বিষয় সম্পর্কে পরস্পরের মনোভঙ্গির পরিচয় প্রতিফলিত হয়েছে। যৌবনের প্রথম ভাগে আল মাহমুদ সাম্যবাদে বিশ্বাসী হয়ে মার্কসীয় দর্শনে বশীভূত ছিলেন। পরিণত বয়সে এসে একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচয় ও প্রকাশ করতে বেশি উৎসাহী হয়েছেন। আদর্শগতভাবে ইসলামী জীবন-যাপনে তিনি পরিতৃপ্ত হয়েছেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছন তিনি। একজন কবি হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তাকে স্বাধীনতাবিরোধী বিশেষ একটি দলের সাথে সখ্যতা তৈরির অভিযোগ করা হয়। এই অভিযোগের সত্যাসত্য নিষ্পত্তি হবে না?
মূলত এখান থেকেই কবি আল মাহমুদকে আলাদাভাবে শণাক্ত করার প্রয়াস দেখা দেয়। যেহেতু তিনি ইসলামী ভাবাপন্ন, সেহেতু বাংলাদেশে বিদ্যমান ইসলামী নানা সংগঠন বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাকে আমন্ত্রণ জানায়। কবিও সাগ্রহে সে সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে তার গায়ে ধর্মীয় রাজনীতির ট্যাগ লেগে যায়। যদিও এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ ব্যাপারে তার নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করেছেন- ‘আমি ধর্ম করি বিশ্বাসের জায়গা থেকে। আমি কোনো ধর্মীয় রাজনীতি করি না। যেসব সভায় আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় তার খবর পত্রিকায় পড়লে দেখবে বক্তৃতায় আমি আমার কথাই বলেছি। আমি কখনো ধর্মীয় রাজনীতির কথা বলি না। আজ পর্যন্ত আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই। এসব কথা আমি খোলাখুলি সাক্ষাৎকারে বলেছি। কোনো বিশেষ দল আমার পৃষ্ঠপোষকও নয়। কেউ আমাকে আর্থিক সাহায্যও করে না। আমি দখিনা বাতাস খেয়ে বেঁচে আছি। তারা মনে করে কবিরা বাতাস খেয়ে বাঁচে’। (শহীদুল ইসলাম রিপন কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকার থেকে)।
আল মাহমুদ কবি হিসেবে যতটা না আলোচিত, ধর্মবিশ্বাসের নিবিড়তা এবং বিশেষ একটি দলের সাথে তাকে ‘লেপ্টে থাকা অথবা দেওয়া’র জন্যে তিনি ততোধিক সমালোচিত। শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদের প্রতিদ্বন্দ্বিপূর্ণ অবস্থার চিত্র এখানে এসে কিছুটা রঙিন হয়ে ওঠে। যেহেতু শামসুর রাহমান প্রগতিশীল কবিকুলের কাতারে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক মনোভাবকে ব্যক্তিগতভাবে ধারণ করতেন। সেহেতু আল মাহমুদ অনুসারী ভক্তকুল তাকে ধর্মবিদ্বেষী এবং অন্য একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের দিকে ঠেলে দিলেন। এভাবে শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ-কেন্দ্রিক দুটি পক্ষ স্পষ্ট ভাগ হয়ে যায়। এছাড়া সমসাময়িক ছিলেন বলে দুজনের মনে কাব্যহিংসা তো ছিলোই। আল মাহমুদ তার সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে শামসুর রাহমান সম্পর্কে যে মনোভাব প্রকাশ করেছেন তাতেই কাব্যহিংসা আভাসিত হয়। যেমন-
‘তুমি বিশ্বাস করো আর না-ই করো বাংলাদেশে বর্তমানে আমিই কবিতার আঙ্গিকগত পরিবর্তনের সূচনা করেছি। কেনই-বা স্বীকার করবে, তুমি তো একজন মার্কিসিস্ট। কিন্তু তুমি এটা লুকিয়েও রাখতে পারছ না। এজন্য তোমাকে জোর করে আমার কবিতা না ছেপে শামসুর রাহমানের কবিতা ছাপাতে হচ্ছে, সামনে রাখতে হচ্ছে। এটা তোমাদের একধরনের পরাজয়…’ (শহীদুল ইসলাম রিপন কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকার থেকে)।
আল মাহমুদের চেয়ে শামসুর রাহমান প্রায় ৭ বছরের বড়। ফলে বিউটি বোর্ডিং কিংবা মধুর ক্যান্টিনের সাহিত্য আড্ডায় যখন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক এবং শহীদ কাদরীরা তুমুল আড্ডামুখর তখনও আল মাহমুদ সেভাবে আড্ডায় আসেননি। সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্রে ঢাকায় আসেন ১৯৫৪ সালে। শামসুর রাহমানের ভাষায়- ‘কবি আল মাহমুদের আগমন ঘটে অনেক পরে। আমরা যখন আড্ডা ছেড়ে জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত সেই সময় আল মাহমুদ নিয়মিত আসতেন’। আল মাহমুদের বিভিন্ন লেখা কিংবা সাক্ষাৎকারে শামসুর রাহমান সম্পর্কে মতামত কিংবা মন্তব্য থাকলেও শামসুর রাহমান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। শামসুর রাহমান স্বভাবে কিছুটা লাজুক, বিন¤্র এবং অল্পভাষী। ফলে যখন তখন যাকে তাকে নিয়ে মন্তব্যও খুব একটা দেখা যায় না। এমনকি আল মাহমুদ সম্পর্কে শামসুর রাহমানের মন্তব্য খুব বেশি চোখে পড়ে না। সংক্ষেপিত। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত