প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিভিন্ন সমাজে প্রথা জন্ম নেয়, প্রথা ভাঙে

প্রথা কী? প্রথার জন্ম কোথায়? এমন প্রশ্ন করেছিলেন উত্তর কাঠামোবাদী দার্শনিক ক্লদ লেভি ত্রস্তকে গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্ত্তী। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথা মানে যা প্রচলিত। প্রচলিত সবকিছুরই জন্ম বিশ্বাসের গর্ভে। একেক সমাজের প্রথা একেক রকম তাই।’ দুই দার্শনিকের এমন আলাপের চেয়ে আমার কাছে বেশি আকর্ষনীয় সানি লিওনের বক্তব্য। কফি উইথ করণ জোহরের একটা এপিসোডে তিনি বলেছিলেন, ‘ আমি যখন পর্নোস্টার ছিলাম, তখন আমি অচ্ছুত ছিলাম। তখন পর্নোগ্রাফি নিয়ে মানুষের রুচিতে এমন প্রথা বাস করতো যে, পর্নোস্টার মানেই খারাপ। কিন্তু এখন যখন বিখ্যাত অভিনেত্রী এখন সেই প্রথা আমি ভেঙে দিয়েছি। তাই প্রথা ভাঙারও আমি এক প্রতীক।’

যারা সাহসী তারাই প্রথা ভাঙেন। সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ প্রথা এসব আর এখন প্রথা হিসেবে বেঁচে নেই। কারণ কী? কারণ সমাজের উপরিস্তরে যখন অধিকাঠামোর উন্নয়নের রূপ দেখা দেয় তখন প্রথাও আপনাঅপনি ভেঙে যায়। তবে তৈরি হয় নতুন আদলে নতুন প্রথার। যেন পুরনো প্রথা চলে যায় রিসাইকেলবিনে। নতুন প্রথার ইন্সটল হয় মগজের নিউরনে। উদাহরণ মানুষের নগ্নরূপে থাকা ঘোরা আদিম যুগে ছিলো। কলকাতার কুম্ভমেলায় হয় এখন বাৎসরিক। দেখুন এখন এটি চলে গেছে রিসাইকেলবিনে। কিন্তু নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটিই ফিরে এসেছে অন্য আদলে। যেমন ন্যুড মুভমেন্ট। ন্যুডিস্ট ক্লাব।  প্রথার প্রকাশ পায় ভাষার রাজনীতিতেও।

যেমন যৌনকর্ম। এটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। কিন্তু এই যৌনতা শব্দটি এসেছে নারীর ‘যোনি’ থেকে। যেমনি এসেছে রমণ করা থেকে ‘রমণী’ মহল থেকে ‘মহিলা’। এ রকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। তাই প্রথার বিরুদ্ধে আপনাকে আমাকে দাঁড়াতে হলে ভাষার রাজনীতিও বুঝতে হবে। নিশ্চয়ই কোনো নারী তাকে ‘ রমণী ’বা মহিলা’ বললে খুশি হওয়ার কথা নয়। এসব ভাষার প্রথাকে ভাঙতে হবে তাই।

সামাজিক এক প্রথা। ধর্মেরও আগে যার জন্ম। তবে ধর্মের নামে চলা একধরনের আচার অনুষ্ঠান, নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, বিশ^াস বা কাজ যা অধিকাংশ মানুষ বা সমাজ উৎপত্তিকাল থেকে যুগ যুগ ধরে পালন করাসহ মেনে আসছে। বিষয়গুলো সাধারণত একই দেশ, সংস্কৃতি, সময়কাল বা ধর্মীয় রীতিনীতি দিয়ে পালন করা হয় ও আপনাআপনি গড়ে ওঠে। এই প্রথার মাঝ দিয়েই মূলত একশ্রেণির মানুষ গড়ে তোলে আধিপত্যবাদের চর্চা। কতো সহ¯্র প্রথা যে সামাজিক আচারের অংশ হয়ে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থাতেও টিকে যায় অন্য আদলে এর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রথার জন্ম কার গর্ভে? বিশ্বাসের গর্ভে। বিশ্বাস একটি অন্ধ ধারণা থেকে জন্ম নেয়। ভাষার রাজনীতি যারা বোঝেন তারা বিশ্বাসের চেয়ে ‘আস্থা’ শব্দ প্রয়োগেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যাক, এবার পৃথিবীর মাঝে চলমান ৯টি প্রথা নিয়ে একটু ধারণা দিই। উত্তর আফ্রিকার মৌরিতানিয়ায় লেবলাহ বলে এক প্রথায় ছয় বছর বাচ্চা বয়স থেকেই স্কুল ছুটির দিনে খাওয়ানো হয় ২০ লিটার দুধ, প্রায় দুই কেজি শস্যদানা আর দুই কাপ মাখন। একধরনের মোটাতাজাকরণ এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে বাচ্চার বমি হওয়া অবধি। না খেতে চাইলে তার পা দু’টি বাঁশাকৃতির বস্তা দিয়ে চেপে ধরে খাওয়ানো হয়। ভারতে দেবদাসী হিসেবে নি¤œবর্ণের কিশোরীকে তুলে দেয়া হয় মন্দিরে দেবতার উৎসর্গে। যা কার্যত নারীদের হাজার বছরের প্রথার মাঝে টিকে থাকা যৌন নিপীড়ন। ১৯৮৮ সালে নিষিদ্ধ হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, মহারাষ্ট্রে, ওড়িষ্যায় এবং গুজরাটে দেবতাকে উৎসর্গ করার নামে দেবদাসীদের প্রধানত যৌনকর্মে ব্যবহার করা হয়। নেপালের কিছু প্রান্তিক অঞ্চলে রজঃকালীন সময়ে নারীদের থাকতে দেয়া হয় গোশালায়। হাইকোর্ট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও এই কুপ্রথা সমাজ থেকে দূর করা সম্ভব হয়নি।

পৃথিবীর সব দেশেই সব ধর্মেও রজঃকালীন নারীকে অপবিত্র মনে করে নানা সামাজিক কাজকর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। আরেক আফ্রিকান দেশ ক্যামেরুনে নারীর সুউচ্চ স্তন যেন লজ্জাকর বস্তু। স্তনের আভাস দেখা দিলেই লোহার পাত দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয় বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত। পাপুয়ার দানি নৃগোষ্ঠীতে পরিবারের সদস্য মারা গেলে তার কাছের সজ্জনকে কেটে ফেলতে হয় আঙুলের সবচেয়ে ওপরের অংশটি। মৃতের পুরুষ সজ্জন বেঁচে থাকলেও নারীকেই শিকার হতে হয় এই প্রথার। বর্তমানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই কুপ্রথা। ইথিওপিয়ার মুরসি ও সুরমা নৃগোষ্ঠীর নারীরা তাদের সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ঠোঁট ছিদ্র করে তাতে ডিস্ক সদৃশ প্লেট পরে। ১২ সেন্টিমিটার বা তার চেয়েও বড় আকারের ডিস্ক তাদের হাসাকৃতির ঠোঁট গড়ার কাজে লাগায়। বলা হয়, যে কনের ডিস্ক যতো বড়, তার পণ প্রাপ্তির মাত্রাও ততো বাড়তে থাকে। মিয়ানমারের কায়া আদিবাসীদের জিরাফ মানবী বললেও ভুল হবে না। দীর্ঘ গলার এই নারীদের ছোটবেলা থেকেই তামার শক্ত কয়েল পেঁচিয়ে দেয়া হয়। নারীর বয়স আর উচ্চতার সাথে সাথে কয়েলের উচ্চতাও বাড়তে থাকে। বিয়ের রাতেই শুধু খুলে দেয়া হয় সেই কয়েল। কয়েল রাখা বা খোলার সময়ের পরিস্থিতি বেদনাদায়ক নিপীড়ন ছাড়া কিছুই না। আফ্রিকার সুদানসহ অসংখ্য মুসলিম দেশ ও এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় নারীকে খৎনা নামক বিভীষিকাময় এক প্রথার অধীনে থাকতে হয়। নারী যাতে বিয়ের আগে যৌনকর্মে যুক্ত হতে না পারে সেজন্য নারীর যৌনাঙ্গে আংটা পরিয়ে দেয়া হয়! যা মূলত নারীর যৌন ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করারই এক প্রক্রিয়া। খুব অল্প বয়সে মেয়ে শিশুর ভগাঙ্কুর কেটে দেবার মাঝে চলে এই সামাজিক প্রথা। একেক সমাজের গড়ে ওঠা প্রথা আরেক সমাজের কাছে হয়তো ভয়ঙ্কর। কিন্তু একটু সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে, সব সমাজেরই লক্ষ্যবস্তু নারী। কারণ কিছুই নয়। সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার রাজনীতি। আমরা ভুলে যাইনি আজকের উন্নত ইউরোপে একসময় নারীকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো। এর পেছনের কারণও স্পষ্ট। সেটি কী? সেটি হচ্ছে দ-মু-ের কর্তা যে হবে সেই তো দ-মু- দিবে অধীনস্তকে। বিষয়টা তাই না? তবে   সভ্যতার সাথে সাথে যেমন বিশ^াস আর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়, তেমন পাল্টায় প্রথার রূপও। হয়তো একসময়ের সরাসরি নির্যাতনের পথ ছেড়ে সেটি আসে নতুন রূপে। নতুন মোড়কে।

লেখক : প্রভাষক, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

সর্বাধিক পঠিত