প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানবতাবিরোধী সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা জরুরি

ড. তপন বাগচী : একাত্তরের যেসকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিলো, তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতে ১৪ ডিসেম্বরকে আমরা বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করি। ২৫ মার্চ থেকেই তো পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশ ভূখ-ের মুক্তিকামী নির্বিচারে হত্যা করা শুরু করেছিলো মুক্তিকামী সাধারণ মানুষকে। তাঁদের মধ্যে শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ছিলো। কিন্তু ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বুঝলো যে, এদেশের সাধারণ মানুষেরা কাছে তাদের পরাজয় অনিবার্য, তখন তারা নতুন কৌশল অবলম্বন করলো। তারা বঝুতে পারলো, ভারতীয় মিত্রবাহিনি এদেশের নিরস্ত্র বাঙালির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। তখন তারা পিছু হটতে শুরু করলো। কিন্তু   তার আগে অর্থাৎ আত্মসমর্পণের আগে তারা বাংলাদেশের হৃদপি- উপড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করলো। বেছে বেছে দেশের সেরা মানুষ, যাঁদেরকে বুদ্ধিজীবী বলা হয়, তাঁদেরকে হত্যা করতে শুরু করলো। কেন তাঁদের হত্যা করা হলো? বাংলা একাডেমি প্রকাশিত রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, “এটা অবধারিত হয়, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, জাগিয়ে রাখেন তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে নির্বীর্য করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবী শূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো অতর্কিতে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বরর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রুতগতিতে।”

কাদের হত্যা করা হয়েছিলো এই দিনগুলোতে? ৯ মাস জুড়ে যে সকল বুদ্ধিজীবকে হত্যা করা হয়, তাঁর বেশির ভাগই ছিলেন শিক্ষক। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শন), মুনীর চৌধুরী (বাংলা), ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা), অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা), আনোয়ার পাশা (বাংলা), ড.  আবুল খায়ের (ইতিহাস), ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি), ড.  সিরাজুল হক খান (শিক্ষা), ড. এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিক্ষা), হুমায়ুন কবীর (ইংরেজি), রাশিদুল হাসান (ইংরেজি), সাজিদুল হাসান  (পদার্থবিদ্যা),  ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকাবিজ্ঞান), এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান), এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা), শরাফত আলী (গণিত), এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা), এম এ সাদেক (শিক্ষা), এম সাদত আলী (শিক্ষা), সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস), গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস), প্রমুখ। ডাক্তারদের মধ্যে মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি, শামসুদ্দীন আহমেদ, আব্দুল আলিম চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়া সাংবাদিকদের মধ্যে  শহীদুল্লাহ কায়সার, নিজামুদ্দীন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, সিরাজুদ্দীন হোসেন, আ ন ম গোলাম মুস্তফা। এ ছাড়াও শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সমাজসেবী রণদাপ্রসাদ সাহা, শিক্ষাবিদ বিজ্ঞানী যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, কবি মেহেরুন্নেসা,  আয়ুূর্বেদিক চিকিৎসক নূতন চন্দ্র সিংহ প্রমুখ। সারা দেশের ৯৯১জন শিক্ষক, ১৩জন সাংবাদিক, ৪৯জন চিকিৎসক, ৪২জন আইনজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিক ও অন্যান্য পেশার ১৬ জন বুদ্ধিজীবীকে তারা হত্যা করে। এ সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা না হলে স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে তাঁরাই নেতৃত্ব দিতেন, পরামর্শ দিতেন, দিকনির্দেশনা দিতেন। দেশ স্বাধীন হলেও যেন দ্রুত এগিয়ে যেতে না পারে, যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে, সেই ষড়যন্ত্র হিসেবে এই হত্যাকা-। পাকিস্তান যে কতো জঘন্য কাজ করতে পারে, এটা তার নমুনা। এই কাজ করতে পাকিস্তানের পাকিস্তানি সামরিকজান্তার পক্ষে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলো মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে সহযোগিতা করেছে বাঙালি আলবদরবাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিলো বদর বাহিনীর অপারেশন ইন-চার্জ চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও প্রধান জল্লাদ আশরাফুজ্জামান খান।  আশরাফুজ্জামান খানের ডায়েরিতে  ২০জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও ঠিকানা লেখা ছিলো। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বদ্ধভূমি থেকে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায়, যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিলো। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ছিলো ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সে  বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিতো। আরো ছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সারের হত্যাকারী  এ বি এম খালেক মজুমদার, ডাঃ আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী  মাওলানা আবদুল মান্নান,  কবি মেহেরুন্নেসার হত্যাকারী আবদুল কাদের মোল্লা প্রমুখ। এছাড়া  চট্টগ্রামে প্রধান হত্যাকারী ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং গিয়াস কাদের চৌধুরী। এদের অনেকরেই বিচার হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। আরো অনেকে পার পেয়ে  যাচ্ছে। অনেকে পালিয়ে বেঁচেছে। অনেকে মরে বেঁচেছে। কিন্তু ইতিহাসের স্বার্থেই সকলের তালিকা তৈরি জরুরি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে গঠিতব্য নতুন সরকারের কাছে দায়ী থাকবে মানবতাবিরোধী সকল অপরাধীকে শনাক্ত করা জরুরি, সে জীবিতই হোক বা মৃতই হোক। লেখক : কবি-প্রাবন্ধিক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত