প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে কৃতজ্ঞতা

মুহাম্মদ আবদুল হামিদ : সামাজিক নিয়ম হচ্ছে উপকারের বিনিময়ে উপকার করা। যেহেতু সব উপকারের বিনিময়ে উপকার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই। আর এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মধ্যে রয়েছে অনেক কল্যাণ। তাই তো গুণীজনরা বলেন, কোনো পুরস্কার দিতে তোমার হাত যদি সংকীর্ণ হয় তাহলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তোমার জিহ্বাকে যথেষ্ট লম্বা করো। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি ওইসব লোকের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে, যারা আমাদের উপকার করেন। উপকারী ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব একটি হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়, যাতে রসুল (সা.) বলেন, যে কেউ মানুষের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না। (তিরমিজি- ১৯৫৫)। দুনিয়ার সাধারণ নিয়মে আমরা ভদ্রতাসুলভ উপকারী ব্যক্তির উপকারের বিনিময়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘শুকরিয়া’, ‘যাজাকাল্লাহ’, ‘ধন্যবাদ’ এ-জাতীয় কোনো শব্দ উচ্চারণ করে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। তবে হাদিসের ভাষায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সর্বোত্তম পরিভাষা হচ্ছে, ‘যাজাকাল্লাহু খাইরান’ অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা শুধু ভদ্রতাই নয়; বরং এতে রয়েছে প্রত্যেক মানুষের শারীরিক, মানসিক অনেক উপকার। টাইম ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৩ সালে ২ হাজার ৬১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে : যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। ওই নিবন্ধে আরেকটি গবেষণার কথা বলা হয়েছে। ওই গবেষণার ফলাফল ছিল, ‘মানুষকে নিয়মিত আরো বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনম্মন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যা ৭৬ ভাগ পর্যন্ত দূর করা যায়।’ এক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতামত হলো, ‘কৃতজ্ঞতার মনোভাব লোকদের আরো ইতিবাচক হতে, উত্তম অভিজ্ঞতা থেকে আনন্দ লাভ করতে, স্বাস্থ্যকে আরো উন্নত করতে, দুর্দশার সঙ্গে মোকাবিলা করতে এবং দৃঢ়বন্ধন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।’

কৃতজ্ঞতা প্রকাশে প্রতিটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক উপকার নিহিত রয়েছে বলেই কোরআনে আল্লাহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি আমাদের দৈনিক নামাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা সর্বদা নামাজে দাঁড়িয়ে বলি, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’- সব প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য অবশ্যই দৈনিক পাঁচবার নামাজ আদায় করতে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ১৭ রাকাত হলো ফরজ, সঙ্গে সুন্নত নফল তো আছেই। প্রতি রাকাতে আমাদের সুরাতুল ফাতেহা অবশ্যই পড়তে হয়। তার মানে হচ্ছে, আমরা নামাজের প্রতিটি রাকাতে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বাধ্যতামূলকভাবে মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। এভাবেই আল্লাহ আমাদের বেশি বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। আল্লাহ্তায়ালা দুনিয়াবাসীর প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, অফুরন্ত নেয়ামত দান করেছেন, এর বিনিময়ে তিনি তার স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। আল-কোরআনের সুরায়ে বাকারাহ, সুরায়ে লোকমানসহ একাধিক স্থানে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, আর অকৃতজ্ঞ হয়ো না। সুতরাং আমাদের অবশ্যই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে।

কোরআনে আল্লাহপাক কৃতজ্ঞতার প্রসঙ্গ যতবার উল্লেখ করেছেন, ততবারই অকৃতজ্ঞ হতে নিষেধ করেছেন। কেননা অকৃতজ্ঞতা ও দম্ভের কারণে শয়তান অভিশপ্ত হয়েছে। আর অভিশপ্ত শয়তান এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, সে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের অনিষ্ঠ সাধনে কাজ করে যাবে। তাই শয়তান মানুষকে খুব কৌশলে অকৃতজ্ঞ বানায়। শয়তান কীভাবে মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানাবে, সে বলে দিয়েছে। আল্লাহপাক মানুষকে সতর্ক করার জন্য কোরআনে উল্লেখ করেছেন, আমি মানুষের কাছে আসব ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই অকৃতজ্ঞ। (সুরা আ’রাফ, আয়াত : ১৭)। অকৃতজ্ঞতা আর হা-হুতাশের কারণে আমরা অনেকেই হাইপ্রেসার, ডিপ্রেশনসহ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগী। আমাদের জীবনকে করে তুলি দুর্বিষহ। পরকালীন জীবনের চিরস্থায়ী সুখ-শান্তিও অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যায়। এতে করে শয়তান হয় মহাখুশি। আর আল্লাহপাক নারাজ হন। অকৃতজ্ঞতার এমন আরো অসংখ্য উদাহরণ দেওয়ার আছে যা একধরনের হিংসাও বটে!

বিজ্ঞজনের মতে, হিংসাপ্রবণ লোকেরা খুবই নিচু মন-মানসিকতার হয়ে থাকেন। হিংসার অনলে পুড়ে অন্যের ক্ষতি করার চেয়ে হিংসুক নিজেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং অন্যের ক্ষতি কামনা করার নাম হলো হিংসা। আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতরাজির যথাযথ কৃতজ্ঞতা দেখানোর সামর্থ্য মানুষের নেই। আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের তুলনায় আমাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন খুবই সামান্যমাত্র। এজন্য আল্লাহপাক কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল স্বীয় কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর সে অকৃতজ্ঞ হলে তো আল্লাহ্ অভাবমুক্ত প্রশংসিত।’ (সুরা লোকমান ১২)

সুতরাং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা বান্দার কল্যাণের জন্যেই। আল্লাহ মহান। আমাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার প্রয়োজন তাঁর নেই। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে আমাদেরই কল্যাণের নিমিত্তে।

শিক্ষক, জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারে মদিনা মাদরাসা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ