প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

#মি-টু : উদ্দেশ্য ও প্রাপ্তি কতোটা?

লীনা পারভীন : পশ্চিমা বিশ্বে শুরু হওয়া #মি-টু আন্দোলনের হাওয়া থেকে দূরে নেই বাংলাদেশও। মূলত আমেরিকাতেই প্রথম শুরু হয়েছিলো এই আন্দোলন। ২০০৬ সালে ক্ষুদ্র আকারে থাকলেও ২০১৭ সালে এসে তা ছড়িয়ে পড়ে বাইরের বিভিন্ন দেশেও। এমনকি বাংলাদেশেও এসেছিলো সেই ধাক্কা। বাস্তবে মি-টু মানে হচ্ছে, ‘আমিও’ অর্থাৎ আমিও নিপীড়িত। একজন যখন সাহস করে তার যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে তখন অন্যজন সেই ঘটনার সাথে সংহতি প্রকাশের মতো করেই বলে মি-টু। বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই যেখানে নারীরা জন্মের পর থেকে শুরু করে কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রনির শিকার হয়নি।

মি-টু আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো নির্যাতিত নারীদেরকে সাহস যোগানো। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনাই ছিলো মূল টার্গেট। নির্যাতনের লজ্জা নারীর নয়, নির্যাতকের। তাই নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার মাধ্যমে সমাজের অন্যজনকেও সাহসী করে তোলা এবং অন্যদের জন্য একটা সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যেই শুরু করেছিলো এই আন্দোলন। নারীর জীবনের বাস্তবতা সীমানা ছাড়িয়ে একই রকম আর তাই এই আন্দোলনের বার্তা মুহূর্তেই পৌঁছে যায় হাজার থেকে লাখো নারীর কাছে।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিলো সেটি কী তার অরিজিনাল রূপ ধরে রাখতে পেরেছে? আমেরিকা, ইউরোপের আলোচনা করে লাভ নেই। আলোচনা করতে চাইছি আমাদের এই তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা কোনোটাই কোনোদিক দিয়েই আমেরিকার সাথে তুলনায় আসে না। তাই বলে কী আমাদের দেশে এই আন্দোলন হবে না? অবশ্যই হবে এবং হতেই হবে। যতো বেশি নারী তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো বাস্তব অবস্থা ও সামাজিক সহায়তা পাবে ততোই পাল্টাতে থাকবে সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক প্রেশার শুরু হলেই কেবল রাষ্ট্র বাধ্য হবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে। এখনো পর্যন্ত যতোগুলো আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে আমার কাছে মনে হয়েছে একমাত্র গুগলের কর্মীদেরটাই ছিলো গঠনমূলক ও এক অর্থে সফল কারণ সেই মুভমেন্ট কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছে তাদের যৌননিপীড়নবিরোধী নীতিমালা পাল্টাতে। বাকিগুলোর একটিও কী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো সফলতা আনতে পেরেছে?

আমাদের দেশেও মনে হচ্ছে আন্দোলনের বাহ্যিক হাওয়াকে গায়ে লাগালেও ধরতে পারেনি অন্তর্নিহিত বিষয়টিকে অথবা ধরতে পারলেও সেই দায়িত্বটি নিতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। মি-টু আন্দোলনকে যেভাবে ফেইসবুক ট্রায়ালে পরিণত করা হয়েছে সেটি কতোটা সমর্থনযোগ্য? উদ্দেশ্য যদি হয় নারীর জন্য একটি যোনি নির্যাতনমুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করা তাহলে সেখানে কেবল একজন ব্যক্তি বা দুই তিনজন ব্যক্তিকে টার্গেট করে পরিচালিত হলে সফলতার মাত্রা কী হবে সেটি সহজেই অনুমেয়। মনে রাখা খুব জরুরি যে, সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে চালানো ক্যাম্পেইন এক বিষয় আবার অভিযোগ দায়ের করে শাস্তি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া ভিন্ন বিষয়। কারণ আপনি যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনবেন এবং সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে চাইবেন তখন বিষয়টা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়াধীন হয়ে যায় যেখানে অভিযোগ প্রমাণের একটি দায়ভার চলে আসে। আমাদের সমাজে যেখানে ধর্ষণের প্রমাণ করার অভাবে ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না সেখানে কেমন করে অদৃশ্য যৌন হয়রানির প্রমাণ করবেন আপনি? এখানে আবেগের কিছু নেই বা যুক্তি বিবর্জিত আবেগ দিয়ে কিছু দাঁড় করানো যায় না। আবেগ হচ্ছে ভিক্টিমের প্রতি সহমর্ম প্রকাশ করা আর যুক্তি হচ্ছে সে অভিযোগকে প্রমাণের জন্য যথেষ্ট কর্মপ্রক্রিয়া ও প্রমাণ হাতে রাখা যা প্রায় অসম্ভব। কারণ আপনি চাইলেই যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার নাম, পরিচয় এবং ছবি প্রকাশ করে যেকোনো অভিযোগ করতে পারেন না যদি না সেটা আপনি প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে।

তাই চলতে থাকা এই মি-টু আন্দোলন কতোটা সমাজে কী পরিবর্তন আনতে পারবে সে বিষয়টি মোটেও পরিষ্কার নয়। একজন দুইজনকে টার্গেট করে যদি চলতে থাকে এবং যদি সেখানে নিরঙ্কুশ সমর্থন আদায় না হয় তাহলে সেই নির্দিষ্ট সেক্টরটিতে বরং নারীদের জন্য একপ্রকার নিষেধাজ্ঞাই জারি হবে, আর কিছু হবে না। আমাদের দেশে এখনো বেসরকারি চাকরিতে নব্য বিবাহিত নারীদেরকে নিয়োগ দিতে চায় না। অথবা সদ্য মা হওয়া বা মা হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন নারীদেরকে নিয়োগ দিতে চায় না কেবল ছুটি বা নানা প্রকার মাতৃত্বকালীন ঝামেলা এড়ানোর জন্য। এমন বাস্তবতায় আমাদেরকে ভাবতে হবে যেকোনো আন্দলনে প্রয়োজন বেশিরভাগ নারীর পুরুষের সমর্থন। পুরুষদেরকে বিরোধী পক্ষ বানিয়ে দেয়া যেন না হয় এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য বা আন্দোলনের কর্ম প্রক্রিয়া যেন না হয়ে যায় হিংসাত্মক।

আমাদের দেশে বর্তমানে যে কয়টি অভিযোগ এসেছে তার মধ্যে কয়টা নিয়ে আমরা সবাই সোচ্চার হতে পেরেছি? না, একটিও নয়। কেন? নারী বিষয়ক যেকোনো আন্দোলন খুবই সেনসিটিভ বিষয়। এখানে জড়িত থাকে হাজারো লাখো নারীর অপেক্ষা। যেকোনো আন্দোলনের একটা প্রাপ্তির হিসাব আগেই ঠিক থাকা জরুরি। এই মি-টু আন্দোলনের প্রাপ্তি কতোটা বা এই নিয়ে কয়জন ভাবছেন? আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে এই বিষয়টি কেউ ঘাড়ে নিতে রাজি আছে কি না। সমাজ থেকে বা কর্মক্ষেত্র যেখানেই হোক না কেন, নারীর প্রতি বা পুরুষের প্রতি যৌন হয়রানিকে বন্ধ করতে হলে আগে কাজ করতে হবে নীতিমালার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে। আমাদের দেশের কয়টি প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টের রায় থাকা সত্ত্বেও যৌন নিপীড়নবিরোধী আইন করেছে? কী তাদের শাস্তির প্রক্রিয়া বা কতটা আন্তরিক কর্তৃপক্ষ? এটি একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক কর্মপ্রক্রিয়া যা কেবল ফেসবুকে প্রকাশ করার মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায় না। আর নিপীড়ন কেবল নারীর বিরুদ্ধে পুরুষ করে না, নারীর বিরুদ্ধে নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে নারীও করতে পারে। তাই যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালায় যুক্ত থাকতে হবে সেই সকল প্রকারের কথাই।

হটকারিভাব নিয়ে কোনো আন্দোলনে কেবল হতাশাই আসে, বিভক্তি আসে, সমাধানের কোন রাস্তা আসে না। যেকোনো ইস্যু পেলাম আর নেমে গেলাম এই জায়গা থেকে সরে এসে যদি লজিক্যালি দেখার দৃষ্টি গড়ে তুলতে না পারি তাহলে কয়দিন কেবল কাঁদা ছোড়াছুড়ি আর নিজেদের মধ্যে কোন্দলেই লেখা থাকবে মি-টু আন্দোলনের ফলাফল। যেকোনো অভিযোগের সমাধান করতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়, ফেসবুকের মাধ্যমে নয়। ফেসবুক কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির প্ল্যাটফর্ম, কারও অপরাধের বিচারের জায়গা নয় বা হতে পারে না। এ সত্যকে অস্বীকার করে কেবল বোকারাই।

লেখক : কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ