প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধ

ডা. এম এ হাসান: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের এই ভূমিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসররা ৩০ ধরনের যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। একই রকম ডাচেসল্যান্ড থেকে ইহুদিদের অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে নাজিরা নানা ধরনের নৃশংস যুদ্ধাপরাধ করেছে। কোরিয়ান উপদ্বীপেও জাপানি সৈন্যরা করেছিল একই রকম অপরাধকর্ম।

এসবই অতীতের কথা। আজ আং সাং সু কী’র প্রশ্রয়ে থেকে বার্মিজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা হিসাবে পরিচিত আরকানি জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে। এটা আসলে রোহিঙ্গা জনগণকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করার একটি পরিকল্পিত অপারেশন। এই উচ্ছেদের মাধ্যমে তারা সেখানে গড়ে তুলতে চায় তথাকথিত বুদ্ধিস্ট আধিপাত্য, এবং তৈরি করতে চায় একটি অর্থনৈতিক এলাকা।

বার্মিজ সেনাবাহিনী যে অপরাধ সেখানে করছে, সেটা যে তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই অংশ, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ সেখানে বিদ্যমান। আসলে সেই ১৯৭৮ সাল থেকে নিরীহ ও নিষ্পাপ রোহিঙ্গা জনগণের উপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন চলছে। তাদের এই হামলা ও অত্যাচারের কারণে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে অথবা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।

এই নিরস্ত্র জনগণকে তারা বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে চার ধরনের গণহত্যা, নয় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ১২ ধরনের যুদ্ধাপরাধ করছে।

দেশটির আর্মি এবং বুদ্ধিস্ট মংকরা কেবল যে একটি গণহত্যার সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে তা নয়, একই সাথে তারা এমন একটি বিকৃত ধর্ষণকর্মে লিপ্ত হয়েছে, যা কিনা সবচেয়ে নিকৃষ্ট সাইকোপ্যাথদের চিন্তা থেকেই আসতে পারে। একেবারে শুরু থেকেই মিয়ানমার সরকার আরাকান রাজ্যটিকে গ্রাস করার মতলব করেই থেমে থাকেনি, সেই সঙ্গে একটা জাতিগোষ্ঠীকে দুনিয়া থেকে মুছে ফেলতে চাইছে। আর এই কাজে তাদেরকে সমর্থন জোগাচ্ছে চীন। অতীতে মঙ্গোলিয়ানরা উত্তর চীনের উগাইর ল্যান্ড এবং তিব্বত থেকে একটি জাতিগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করেছিল। এখনকার বার্মিজ সেনারা যেন সেই উদাহরণকেই অনুসরণ করছে।

মিয়ানমারের এমন অপকর্মের জন্য মূল দায় নিঃসন্দেহে তাদের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং কিছু বুদ্ধিস্ট মংকের। আর সেই সঙ্গে আং সাং সু কি কেও এই অপরাধের দায় নিতে হবে, কারণ তিনি শুরু থেকেই অমানবিক এই গণহত্যাকে নানা ভাবে অস্বীকারের চেষ্টা করেছেন। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি বাংলাদেশ মনে করে এই সেনাকর্মকর্তা, মংক এবং সুকির বিরুদ্ধে হেগের আদালতে অবিলম্বে মামলা করা উচিত। যে সকল রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি এইসব অপরাধকে সমর্থন দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্ট, হিউম্যান রাইটস কমিশন, জাতিসংঘ এবং সভ্য দুনিয়ার উচিত তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ, বয়কট, এবং কঠোরভাবে সতর্ক করা।

আর মানবাধিকার নিয়ে যে দেশগুলো বেশি সোচ্চার, তাদের উচিত হবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদেরকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে আশ্রয় দেয়া। বাংলাদেশ এরই মধ্যে সর্বোচ্চ মানবিক ভূমিকা পালন করেছে, এখন বরং অন্যদের পালা। আর সবশেষে একথা মানতেই হবে যে, এই রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে, সেটা তাদের মৌলিক অধিকার।

সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ, যা কিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করে, সেটা আর যাই হোক বিচারহীন থাকতে পারে না। এর কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

(লেখক: ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন। মূল ইংরেজী থেকে অনূদিত এবং ঈষৎ সংক্ষেপিত।)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ