প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিঃসন্তানদের লক্ষ্য এবার ইউক্রেন

শেখ নাঈমা জাবীণ : সন্তানের মুখ দেখতে কে না চায়। সন্তান-সন্তনাাদি নিয়ে হাসি-খুশি জীবনযাপন প্রত্যেকেরই আরাধ্য। তবে যদি কখনো কোনো কারণে কোনো দম্পত্তি সন্তান ধারণে অক্ষম হন তাহলে তাদের জীবন হয়ে পড়ে রীতিমত দুর্বিষহ। সমাজ তাদের প্রতি খুব সহনশীল আচরণ করে না। কষ্ট ও ব্যর্থতার জ্বালা বুকে নিয়েই তাদের দিন কাটে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য এক আশার আলো হয়ে উঠেছে সারোগেসি বা ‘গর্ভ ভাড়া’ পদ্ধতি। কারণ একমাত্র এ পদ্ধতিতেই সন্তান জন্মদানে অক্ষম বাবা মা সন্তান লাভ করতে পারেন। তবে গর্ভ ভাড়া দেওয়া বা নেওয়া একটি মহৎ দিক থাকলেও যথাযথভাবে আইন কানুন না মানায় গোটা বিষয়টিই অধিকাংশের জন্য বিশাল ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সারোগেসি বা গর্ভ ভাড়া পদ্ধতি কখনোই খুব সহজ ছিল না। প্রথম বাধা হিসেবে বলা যায় এটি বেশ ব্যয়বহুল। আবার বিশ্বের অনেক দেশেই বাণিজ্যিকভাবে গর্ভ ভাড়া নিষিদ্ধ। অনেকদিন ধরেই ইউরোপ কিংবা আমেরিকার দম্পতিদের কাছে এশিয়া সারোগেসি ডেস্টিনেসন হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিল। ফলে একে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল এক লাভজনক ব্যবসা। এর মধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড ও নেপাল সবার শীর্ষে। এশিয়ার দেশগুলোর ‘রিপ্রোডাক্টিভ ডেস্টিনেসন’ হয়ে ওঠার পেছনে মূল কারণ হল সহজে গর্ভ ভাড়া পাওয়া। কিন্তু কম খরচের সাথে যে ঝুঁকিগুলো তৈরি হয় তা নিয়ে কাজ করার কোন উদ্যোগ কখনো গড়ে ওঠেনি। গর্ভ ভাড়া দেওয়া মায়ের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মত বিষয়গুলো কখনোই গুরুত্ব পায়নি। এ অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য এবং অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে বেশ ভাল ব্যবসা চালাচ্ছিল বিভিন্ন এজেন্সিগুলো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ড ও নেপাল বিদেশী দম্পতিদের সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান গ্রহণ নিষিদ্ধ করে আইন জারি করেছে। একইসঙ্গে ভারতও সব ধরণের বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ করেছে। ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ রমরমা ব্যবসা এখন চলে গেছে ইউক্রেনের মত দেশে।

গর্ভ ভাড়ায় কখনোই মাতৃত্বকে উদযাপন করার মত কিছু ছিল না। বর্তমানে জেস্টেসেন পদ্ধতিতে বাবা মায়ের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু বাইরেই নিষিক্ত করে সারোগেট মায়ের গর্ভে স্থাপন করা হয়। তাতে করে গর্ভ ভাড়া দেয়া মায়ের সাথে কোনো ধরণের জৈবিক সম্পর্ক থাকে না শিশুটির। মূলত মা ব্যবহৃত হয় ‘জৈবিক শ্রমিক’ হিসেবে। তাই নিঃসন্তান দম্পতির জন্য আশীর্বাদ হলেও দরিদ্র মহিলাদের জন্য সারোগেসি আর্থিক সচ্ছলতার লাভের একটি উপায় ছাড়া আর কিছুই না।

ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইউক্রেনে বাস বা মেট্রোতে চড়লেই দেখা যাবে গর্ভ ভাড়া নেয়ার বিজ্ঞাপন। খুব সহজেই পাওয়া যাবে আগ্রহী যে কাউকে। ইউক্রেনে প্রতি বছর প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ সারোগেসি হয়ে থাকে। আর এর অর্ধেকই হয় জনপ্রিয় সারোগেসি কোম্পানি বায়োটেক্সকমের মাধ্যমে। মূলত ভারত, থাইল্যান্ড ও নেপালে সারোগেসি নিষিদ্ধ হওয়ার পরই এ ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ইউক্রেনে আইনত বিধিনিষেধ না থাকলেও অনেক সারোগেসিই নিয়মমাফিক হয় না। খেয়াল রাখা হয় না সারোগেট মায়েদের সুরক্ষার দিকেও। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মাকেও ঠিকভাবে জানানো হয় না বিষয়গুলো।
বায়োটেক্সকমের এমন এক সারোগেট মা হলেন এলিনা। ২০১৬ সালে একবার গর্ভধারণের জন্য বায়োটেক্সকম তাকে এককালীন ১১০০০ ডলার ও মাসিক ২৫০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এক ছেলের মা এলিনা পেশায় হেয়ার ড্রেসার। সন্তানের পড়াশোনা থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচের কথা ভেবে গর্ভ ভাড়া দেওয়ার এ লোভনীয় প্রস্তাব ফেলতে পারেননি তিনি। কোম্পানি ভাল খেয়াল রাখবে এমনটিই বলা হয়েছিল তাকে। তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত তেমন থাকেনি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গর্ভধারণের আট মাসের মাথায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে। যেখানে আরও চার জন সারোগেট মা ছিলেন। সেখানে তাকে অন্য এক মায়ের সাথে বিছানা শেয়ার করতে হয়। তাদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হত। যে হাসপাতালে তার সন্তান জন্ম নেয় সেখানকার সুযোগ সুবিধা ভাল ছিল না। ডাক্তাররা তাদের অবহেলা করতেন ও তাদের নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তবে এসব নিয়ে হবু বাবা মার কাছে কোন অভিযোগ জানানোর সুযোগ ছিল না তার। অভিযোগ করলে চুক্তি বাতিলের হুমকি দেয়া হত।
সন্তান জন্ম দেয়ার পরও স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় এলিনাকে। সে বিষয়টিও ভালভাবে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। আর এত ঘটনার কিছুই জানতেন না হবু মা আনকা। এলিনা ইনটেসিভ কেয়ারে থাকা অবস্থায় তাকে মেসেজ করলে প্রথম ঘটনা সর্ম্পকে জানতে পারেন তিনি।
সন্তানের জন্ম দিতে পেরে এলিনা যদিও খুশি, তবে সারোগেসি নিয়ে এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার পর আর কখনোও সারোগেট মা হবার ইচ্ছে নেই তার।

ইউক্রেনে সারোগেট মায়েদের প্রতি এমন অবহেলার অভিযোগ নতুন নয়। সারোগেট কোম্পানিগুলো হবু বাবা মায়ের সাথে এমনভাবে চুক্তি করে যাতে সন্তান জন্মদানের পর এ সংক্রান্ত কোন দায় নিতে না হয়। লোভনীয় অংকের অর্থের প্রস্তাব দিয়ে সারোগেট মায়েদের প্রলুব্ধ করা হলেও অনেকসময় পাওনা ঠিকভাবে পরিশোধ করা হয় না। এর পাশাপাশি অন্যান্য উদাসীনতা তো আছেই। ইউক্রেনের নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে যে ব্যবসা গড়ে উঠেছে তা একাধারে সারোগেট মা থেকে শুরু করে হবু বাবা মা সবাইকেই ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। সারোগেট নারীদের এখন শুধুই বেবি ফ্যাক্টরি ছাড়া আর কিছুই মনে করা হচ্ছে না। এতে নতুন করে নারী পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সারোগেসি নিষিদ্ধ হওয়ায় খুব কম জায়গাতেই স্বল্প খরচে সারোগেসি করানো যায়। তাই এসব নারীদের অন্যান্য দেশে পাচার করে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। ফলে অপরাধমূলক চক্রের ফাঁদে পড়তে পারেন আগ্রহী বাবা মা।

সারোগেট মায়েদের অধিকার, সুযোগ সুবিধার বিষয়গুলো একটি সুন্দর নিয়মের মধ্যে আনা গেলে তা সবার জন্যই মঙ্গলজনক। নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান লাভ যেমন হবে পাশাপাশি অনেক নারীও এতে জীবনধারনের নিশ্চয়তা খুঁজে পাবেন।
সূত্র : আল জাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ডি ডাব্লিউ ও অ্যাবোভ দ্য ল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ