প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোটের গন্ধ, ভোট আসছে…

ড. জোবাইদা নাসরীন : আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচন একটু আলাদা। এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হবে। তাই সবার হিসাব-নিকাশও একটু ভিন্ন। ঈদের পর থেকেই সবকিছুর মধ্যে কীভাবে যেন ঢুকে গেছে নির্বাচন ঘ্রাণ। যার কারণে সবার মধ্যেই ঘুরেফিরে একটাই আলোচনা, তা হলো নির্বাচন। রাজনৈতিক বাগানে সদ্য গাজানো যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য সবই নির্বাচনকে ঘিরে। ক্যালকুলেটার নিয়ে বসছেন অনেকেই। করছেন প্রার্থীর তালিকা, কষছেন ভোটের হিসাব।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই তীব্র যোগাযোগে আছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। কারো কারো ছবি আসছে পত্রিকায়। এখানেই শেষ নয়, সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেরই এখন এলাকাতেই। গণসংযোগ করে ভোটারদের মন জয়ের পাশাপাশি দলীয় নেতাদের নজর পাওয়ার চেষ্টা করছেন। পত্রিকার খবের জানা যায়, প্রায় একশর মতো নির্বাচিত এমপি এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নাও পেতে পারেন। এই সংবাদ বিভিন্ন এলাকায় নতুন মুখের আনাগোনা বাড়িয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কিনা? খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন কিনা? তারেক রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা? শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে কিনা? বিএনপি নির্বাচনে না এলে নির্বাচন হবে কিনা? কিংবা নির্বাচন হলেও সেটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা? এবং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন নির্বাচন আদৌ হবে কিনা? নির্বাচনিক গণতন্ত্র এখন নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ বাদে অন্য প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর।

আমরা সবাই জানি ভোট প্রত্যেক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। আঠারো বছর হলেই ভোট প্রদানের ক্ষমতা একজন মানুষকে অনেক বেশি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে জোরদার করে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে নির্বাচন ভাবনার কোনো পাটাতনেই সাধারণ মানুষরা আলোচনায় নেই। অথচ নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন দেশের ভোটাররা। এই ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কিনা, ভয় বা আতঙ্ক ছাড়া ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারবেন কিনা? নির্বাচন সঠিকভাবে হবে কিনা? সেটি নিয়ে কোনো শামিয়ানাতেই কোনো বাহাস নেই। যারা ভোটার তাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাই হলো প্রথম গণতন্ত্র। তবে বাংলাদেশে আন্দোলন এবং অনেক জীবনের দামে কেনা গণতন্ত্রের বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি হলেও নির্বাচনে ভয়হীনভাবে ভোট প্রদানের অধিকারচর্চা এখনো রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করা যায়নি।

ভোট প্রদানের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকারটি একজন শিক্ষার্থীর প্রথমেই চর্চা করার কথা তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অর্থাৎ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ থেকে স্বৈরতন্ত্র বিদায় নিল এবং গণতন্ত্র এলো। কিন্তু সেই সঙ্গে বিদায় নিল ডাকসু নির্বাচনও। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আর ডাকসু হতে পারেনি। পুরো দেশ যখন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আচ্ছন্ন, দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল দেশ এবং বিদেশের নানা দরবারে হাজিরা দিচ্ছে তখন হাইকোর্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্মরণ করিয়ে দিলেন তাদের নির্বাচনের কথা এবং নোটিশ দেওয়া হলো আদালত অবমাননার। শেষ ডাকসু নির্বাচনের আটাশ বছর পর হলেও কিছুটা আশার মুখ দেখছে স্মৃতিতে মরচে পড়া ডাকসু নির্বাচন। আদালত অবমাননার অভিযোগে নোটিশ পাওয়ার পর ডাকসুকে নিয়ে কিছুটা নড়াচড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অবস্থা বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, সেখানেও লাগছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রশাসন সবে পাল তুলেছে। কোনদিকে যাবে এখনই বোঝা যাচ্ছে না। তবে হুঙ্কার দিলেও আদৌ যাওয়া হবে কিনা সেটিও বলা কঠিন, কারণ সবই নির্ভর করছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর।

বিভিন্ন কারণেই জাতীয় নির্বাচন এ দেশের মানুষের কাছে অর্থবহ। যদিও প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচন হয়। কিন্তু সবকিছুর পরও এ দেশের মানুষের কাছে জাতীয় নির্বাচনের তাৎপর্য আলাদা। কারণ জাতীয় নির্বাচনের মেজাজ আলাদা, ধরন আলাদা এবং কাজের দিক থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের অনেক কিছু নির্ভর করে। নির্ভর করে আমাদের সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুও হয়তো। নির্বাচন নিয়ে যেমন আমাদের জীবনে উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে, তেমনি আছে ভয় এবং উৎকণ্ঠা। কারণ বিগত নির্বাচনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার কথা, সেই সহিংসতায় কয়েকশ লোকের প্রাণহানির কথা, সংখ্যালঘুসহ সমাজের দুর্বলতর মানুষদের অনিরাপত্তার কথা। আমরা পুরোপুরি না জানলেও এখন থেকেই আন্দাজ করেত পারি, নির্বাচনের আগের বাকি তিন মাস বাংলাদেশ কী কী ঘটতে পারে? মানুষের মনে কী কী ধরনের ভয়ের আনাগোনা হতে পারে? প্রতিবছরের মতো এবারও নির্বাচনের আগে বেশকিছু সংখ্যালঘু মানুষ দেশত্যাগ করবেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ভয়ে। অনেক সংখ্যালঘু বিয়েযোগ্য মেয়েকে পাঠিয়ে দেবেন দেশের বাইরে, এই ভেবে যে মেয়েটি যেন নিরাপদে থাকতে পারে। অনেকে হয়তো এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন। নির্বাচনী প্রচারণায় মুখরিত হবে দেশ।
ভয়, আতঙ্ক, সন্ত্রাস, অনিশ্চয়তা এতকিছুর পরও এ দেশের মানুষের কাছ ভোট একটা উৎসব। জনগণের ক্ষমতা প্রকাশের একটা বড় জায়গা। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাবেন, ভোট ভিক্ষা করবেন। জীবনে একবারের জন্য হলেও ভোটারদের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ জানাবেন। আশার মুলা আবারও ঝুলবে। ভোটাররা এ-ও জানেন, নির্বাচনের পরের দিন থেকে তাদের কোনো দাম নেই, থাকবে না কোনো মর্যাদা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করা তো দূরের কথা, নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের অনেকের ধারেকাছেও ভোটাররা ঘেঁষতে পারবেন না। তাই অন্তত ভোট উৎসবে সবাই অংশগ্রহণ করেত চান। দিনশেষে জানতে চান তার পছন্দের প্রার্থী জয়লাভ করেছে কিনা। বাংলাদেশে এখন সময় এসেছে না ভোট চালু করার। এর মানে এমন অনেক ভোটার আছেন যারা হয়তো প্রার্থীদের কাউকেই চান না প্রতিনিধি হিসেবে, তারা তাদের সেই অপছন্দটুকুও জানাতে চান, সেই অধিকারের প্রতিও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই পছন্দমতো প্রার্থী না থাকলেও কাউকে না কাউকে ভোট দিতে হয় শুধু অধিকারটুকু প্রয়োগ করার আনন্দ থেক বঞ্চিত না হওয়ার জন্য।

বাংলাদেশের এই নির্বাচনের সময়টাতেই দরিদ্র মানুষরা কিছু আয় করেন। অনেকেই এটিকে খারাপভাবে দেখেন। কিন্তু গবেষক হিসেবে আমরা এটিকে সাধারণ মানুষদের (যাদের আমরা আপাতদৃষ্টিতে ‘অরাজনৈতিক’ মানুষ হিসেবে দেখি) দেনদরবারের জায়গা হিসেবে দেখি। বাংলাদেশের ক্ষমতা বিন্যাসের এবং ক্ষমতা চর্চার জায়গাগুলো এতই স্পষ্ট যে, ভোটারদের আসলে কোনো ধরনের ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ নেই একমাত্র ভোট প্রদান ছাড়া। বাংলাদেশে মৌলিক গণতন্ত্রচর্চার একটা মাত্র উদাহরণই এখনো জিইয়ে আছে আর সেটি হলো নির্বাচন। এর বাইরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আকাক্সক্ষাই জনগণের আকাক্সক্ষায় পরিগণিত হয়, সেখানে জনগণের চাওয়া কিংবা মতামত প্রদানের খুব কমই সুযোগ থাকে। সরকারের সমালোচনাকে সরকার বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়। তাই নির্বাচন ছাড়া জনগণের কোনো ধরনের অংশগ্রহণ কিংবা মতামত প্রদানের সুযোগ আসলেই খুব কম।
তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে প্রত্যেকেই চাইবে নিজের মতো করে দেনদরবার করতে। বাংলাদেশের দরিদ্র ভোটাররা এই সময় কিছু বাড়তি আয়-রোজগারের চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রার্থী তাদের টাকা দেন ভোটের আশায়। ভোট কেনাও আমাদের দেশে নতুন পদ্ধতি নয়। আর ভোটাররাও বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেন ভোট দেবেন বলে। তারা জানেন, এই সময়ের বাইরে কেউ তাদের কাছে আসবেন না। একবার নির্বাচিত হতে পারলেই তখন তারা সেই প্রার্থীর দরজা পর্যন্ত কোনোদিন যেতে পারবেন না তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য। নির্যাতিত হলেও যেতে পারবেন না বিচারের আশায়। তাই ভোটাররাও জানেন এটাই তাদের সময়, প্রার্থীদের সঙ্গে নিজের মতো করে ক্ষমতা চর্চা করার।
ভোটের গন্ধ আজ চারদিকে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্য একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সময়। ভোটের অধিকারটুকু সঠিকভাবে পাওয়ার আকাক্সক্ষা সব ভোটারের। তবে নেতাদের মনোযোগ জনগণের প্রতি নয়, অন্যত্র। কিন্তু জনগণ দেখাতে চান তারাই আসলে এ দেশের মূল চালিকাশক্তি, এ জন্যই নির্বাচনের জন্য এত অপেক্ষা।

লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

(লেখাটি দৈনিক আমাদের সময় থেকে সংগৃহীত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ