প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম সংস্কৃতিতে বিবাহ অনুষ্ঠান

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভিন্ন ভিন্ন সকল সংস্কৃতিতেই বিবাহ অনুষ্ঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান। সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন আচার ও প্রথার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই অনুষ্ঠান। দুইজন মানুষের একত্রে বসবাসের সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের এই অনুষ্ঠান শুধু ব্যক্তিগতভাবে দুইজন মানুষের মধ্যকার নতুন এক সম্পর্কে জড়ানোরই নয়, বরং সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রকার ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন থেকে কিছু বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।

১. ভারত

ভারতে নিকাহ বা ইসলামী পরিভাষায় বিবাহ অনুষ্ঠান বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। মূল বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রথমে মোল্লা-মৌলভী অর্থাৎ সমাজের ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে ইস্তেখারা করানো হয়, যেখানে বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য ও রহমত প্রার্থনা করা হয়। এরপর কুরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কুরআন তেলওয়াতের পর উপস্থিত মৌলভী বর ও কনে উভয়কেই তিনবার প্রশ্ন করেন, তারা কি পরস্পরের মধ্যকার এই বিয়েতে রাজি আছেন কিনা। উভয়ে সম্মতি প্রকাশ করার পর তাদেরকে নিকাহনামা বা বিবাহচুক্তিতে (marriage contract) স্বাক্ষর করার জন্য বলা হয়। এরপর তারা তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে দোয়া ও আর্শিবাদ গ্রহণ করে। উভয়ের পরিবারের সদস্যরা সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। বিবাহ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা নতুন দম্পতিকে বিভিন্ন উপহার প্রদান করেন। পরে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে বিশেষ ভোজে আপ্যায়িত করা হয়।

২. মালয়েশিয়া

স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতি ও ইসলামের সংমিশ্রণে মালয় মুসলিম সমাজে জমকালো ভাবে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রথমত উভয় পরিবারের মাঝে আনুষ্ঠানিক পরিচিতির জন্য অনুষ্ঠান হয়। পরবর্তীতে বিবাহ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তারিখ ঠিক করা হয়। মূল বিবাহের পূর্বে অন্যান্য দেশের মতই মালয়েশিয়ায় হেনা পার্টি বা বর-বধূকে হাতে মেহেদি পরানোর অনুষ্ঠান করা হয়। মূল অনুষ্ঠানের তিন দিন পূর্বে বেরিনেই (Berinai) নামের এই অনুষ্ঠানে বর-বধূর বাড়িতে পৃথক পৃথক অনুষ্ঠানে তাদের হাতে বিভিন্ন নকশায় মেহদি পরানো হয়। মেহদিকে মালয়রা উর্বরতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করে। মূল বিবাহ অনুষ্ঠানটি একজন কাজী বা ইমাম পরিচালনা করেন। কুরআন তেলওয়াতের পর বর-বধূর মত নেওয়ার পরবর্তীতে তাদেরকে বিবাহচুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য বলা হয়।

৩. মরক্কো

মরক্কোর বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে তিন দিন যাবত। প্রথম দিন হাম্মাম দিবস যেখানে মূলত কনে হাম্মামে গোসলের জন্য গমন করে। হাম্মাম মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ গোসলখানা যেখানে সাধারণ গোসলের সাথে স্টিমবাথ বা বাষ্পস্নানের ব্যবস্থা রয়েছে। এইদিন কনে তার বান্ধবী ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে একত্রে গোসল করতে যায়। পরদিন চলে হেনা পার্টি বা মেহদি পরানোর উৎসব। মরক্কোতে মেহদি শুধু উর্বরতারই প্রতীক নয়, বরং তা একইসাথে সৌন্দর্য ও আশারও প্রতীক। পিতার বাড়ীতে কন্যার শেষ রাতের অবস্থানটি হয় অত্যান্ত আবেগঘন বিষয়। মূল বিবাহ অনুষ্ঠানে কনেকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলঙ্কারে সাজানো হয়। কনেকে ‘আমারিয়া’ (amaria) নামে একটি খোলা পালকীতে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বরের বাড়ীতে যাওয়ার পথে বিশেষ গান-বাজনার মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করা হয়। বরকেও খোলা পালকী অথবা ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

৫. সোমালিয়া

সোমালিয়ার সংস্কৃতিতে বিবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিবাহের মাধ্যমে শুধু দুইটি মানুষের মধ্যেই নয়, সোমালিয়ায় বিবাহের মাধ্যমে দুইটি পরিবার এবং অনেকক্ষেত্রে দুইটি গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। বিবাহের মাধ্যমে সোমালিয়ায় গোত্রে গোত্রে মিত্রতা স্থাপন করা হয়। অনেকাংশেই গোত্র প্রাধান্যের এই দেশে প্রায়শই বিবাহ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়না। বরং গোত্রগত আচারের মাধ্যমে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। মূল বিবাহের দিন অতিথিদের জন্য বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং নাচ-গানের আয়োজন করা হয়। কনের পরিবার কনেকে সংসার সাজানোর জন্য বিভিন্ন আসবাব পত্র প্রদান করে।

৬. তুরস্ক

তুরস্কে বিবাহের আয়োজন শুরু হয় বিবাহের জন্য কনের আক্ষরিক অর্থেই পাণি প্রার্থণা তথা হাত চাওয়ার মাধ্যমে। ‘সজ কিসমে’ (Söz Kesme) নামের এই অনুষ্ঠানে অতিথিদের সামনে প্রকাশ্যে এই হাত চাওয়ার মাধ্যমেই বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং বর-কনের মধ্যে বিবাহের কথা পাকাপোক্ত করা হয়। এখানে কনেকে একটি আংটি ও একটি রুমাল দেওয়ার মাধ্যমে এনগেজমেন্ট সম্পন্ন হয়। ঐতিহ্যবাহী বিবাহ অনুষ্ঠানে মূল বিবাহের আগেরদিন যোহর নামাজের সময় বিয়ের পতাকা উড়ানো হয়। বিয়ের আগের রাতে ‘কিনা গেজেসি’ (Kina Gecesi) অনুষ্ঠানে কনের হাতে ও পায়ে মেহদির নকশা আঁকা হয়। বিবাহের দিন কনের কোমরে একটি লাল ফিতা তার পিতা, ভাই বা অন্যকোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বেঁধে দেয়। এটি ‘বেকারেত কুশায়ি’ (Bekaret kuşağı) পরিচিত। বর একজন হোজা (ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি) সহকারে কনের বাড়ীতে আগমনের পরপরই মূল বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হয়। কনেকে তার শাশুড়ী বিভিন্ন উপহার দান করে এবং বিবাহ অনুষ্ঠানে গানবাজনার বিশেষ আয়োজন করা হয়।

৭. বুলগেরিয়া

বুলগেরিয়ার মুসলিম সমাজে বিবাহের জন্য দুইদিনে আয়োজন চলে। প্রথমদিন, বিবাহের সকল উপহার কনের ঘরের সামনে রেখে আসা হয়। দ্বিতীয় দিন, কনের মুখে বিচিত্র রঙে রঙীন করে তার মুখকে ঢেকে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মূলত কনের বিবাহিত জীবনে রূপান্তরকে প্রতীকিভাবে উপস্থাপন করা হয়। মুখ রাঙানোর এই প্রথাকে ‘জেলিনা’ (gelina) বলা হয়। এরপর একজন ইমাম এসে বিবাহের আনুষ্ঠানিক কাজ সম্পন্ন করেন। এরপরে বর কনেকে তার ঘরে নিয়ে আসে। ঘরে আনার সাথে সাথে বর নিজে কনের মুখের রং মুখে ফেলে।

৮. দাগেস্তান, রাশিয়া

রাশিয়ার অধীনে ককেশাসের দাগেস্তান একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত রাষ্ট্র। এখানকার মুসলমানরা বিবাহের দুইটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন; একটি বর এবং অপরটি কনের বাড়ীতে। বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য দূরদূরান্তের লোকজনকে দাওয়াত করা হত এবং এর ফলে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সংখ্যা সাধারণভাবে পাঁচশত থেকে পনেরোশত হত। অতীতে বরের পরিবার কনের পরিবার থেকে দরিদ্র হলে অনেকসময় কনের অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে কনেকে অপহরন করে বিবাহ করতো, যাতে বিবাহ অনুষ্ঠানের অতিথি আপ্যায়নের খরচ থেকে বাঁচা যেতে পারে। বর্তমানে এই সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটেছে। বর্তমানে মসজিদে বর-কনের সাধারণ নিকাহ ও বিবাহচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরে পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের নিয়ে নতুন দম্পত্তি একটি বিবাহত্তর সংবর্ধনার আয়োজনে অংশগ্রহণ করে।

উপরিউক্ত বিবাহের আয়োজনসমূহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র অংশের উপস্থাপন মাত্র। এছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম সমাজে বিবাহ অনুষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন বিচিত্র আচার-প্রথার সমন্বয়ে আয়োজন করা হয়।

উৎস: ইসলামী বার্তা

mvslim.com অবলম্বনে, মুহাম্মদ আল-বাহলুল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ