প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভয়াবহ আকারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

ডেস্ক রিপোর্ট  : অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সোমবার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। মাহিন জ্বরের মধ্যে প্লাটিলেট কমাসহ নানা জটিলতায় ভুগছে। অপরদিকে দ্বিতীয় দফায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মারুফের প্লাটিলেট নেমে এসেছে ২৫ হাজারে। তাই রক্ত দেয়ার পাশাপাশি তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ক্রমবর্ধান হারে বাড়ছে রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা। রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ জন। এরমধ্যে ডেঙ্গু হেমরেজিক অবস্থায় আছেন ৩ জন। চলতি মাসের ১২দিনে আক্রান্ত হয়েছে ৮৯৭ জন। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আর ২৩২ জন। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ি, রাজধানী ঢাকায় গত মে মাসে ডেঙ্গু মশার ঘনত্বের ঝুঁকিমাত্রা ছিলো ৩৩ শতাংশ। জুলাই মাসের জরিপে এডিস মশার ঘনত্বের সেই ঝুঁকিমাত্রা বেড়ে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে। আশঙ্কার কথা, গুলশানের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা বিশেষে সেই ঝুঁকিমাত্রা ৭০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের অসচেতনতা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, বর্ষা মৌসুমের বাকী এখনো প্রায় দু’মাস। এ অবস্থা চলতে থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাড়াবে সে বিষয়ে শঙ্কিত। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই। কারণ ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রন করতে হলে বাড়ি ও বাড়ির আঙ্গিনা অবশ্যই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। অন্যথায় চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এডিস মশার প্রজনন ঠেকানো এবং আক্রান্তদের চিকিৎসায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মেয়র জানান, বর্ষার আগেই তারা এডিস মশার প্রজননপ্রবণ অঞ্চল ধানমন্ডি, কলাবাগান এবং মন্ত্রী পাড়ায় এডিস লার্ভা ধ্বংস করেছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের বেশিরভাগ দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জটিলতা বেশি হচ্ছে। এডিস মশার প্রজনন রোধে ঘরে ফুলের টব বা কোনো পাত্রে পরিষ্কার পানি জমিয়ে না রাখার পরামর্শ চিকিৎসকদের। মশার কামড় থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগে আতঙ্ক নয়, সময় মতো সু-চিকিৎসায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগ ভালো হয় বলে উল্লেখ করেন তারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সচেতনায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগী এবং তার পরিবার উভয়েই ভুক্তভোগী হয়। তাই পরিবারের সদস্যদের যেন ডেঙ্গু না হয়, সে ব্যাপারে সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত ও উৎকণ্ঠিত স্বাস্থ্য বিভাগ বললেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রন) প্রফেসর ডা. সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ গত বছরের তুলনায় বেশি। সচেতনতায় আমরা কাজ করছি। ডেঙ্গু রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের বিষয়ে ইতিমধ্যে কয়েকবার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সাথে বৈঠক হয়েছে। গত সোমবার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সব ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-আইসিইউ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভা করেছি। গতকাল ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা হয়েছে। আজ সিটি কর্পোরেশনের সাথে যৌথভাবে কিভাবে কাজ করা যায় সে নিয়ে আলোচনা আছে। সব আলোচনায়ই হেমরেজিক রোগীদের সঠিক ভাবে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, বাহক বাহিত রোগ কোন বছর বেশি, কোন বছর অপেক্ষকৃত কম হয়ে থাকে। এছাড়াও আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে এডিস মশার সার্ভে করা হয়। আমরা এই সার্ভের রিপোর্ট সিটি করপোরেশনকে দেই। যাতে এডিস মশা প্রতিরোধে সহজে তারা কাজ করতে পারে। এছাড়া জনসচেতনতা সৃষ্টিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ডা. সানিয়া তাহমিনা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার জানান, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত (১২ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৯২৪ জন। এ সময়ে এ রোগে মৃত্যু ঘটেছে ১১ জনের। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (ভর্তি) রয়েছেন ২৩২ জন।

সূত্র মতে, শুধুমাত্র আগস্ট মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১ হাজার ৬৬৬ জন। ডা. আয়েশা জানান, গত জুন মাস থেকে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। ওই মাসে আক্রান্ত হয় ২৭৬ জন। যার মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে। জুলাই মাসে আক্রান্ত হন ৮৮৭ জন এবং মৃত্যু হয় ৪ জনের, আগষ্ট মাসে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৬৬৬ জন এবং মৃত্যু হয় ৪ জনের।

সূত্র জানায়, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। প্রথম দিকে অজানা রোগ এবং রোগ ব্যবস্থাপনা জানা না থাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি ছিলো। পরে রোগের কারণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় চিকিৎসা গাইড লাইন প্রণয়নের মাধ্যমে ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। স¤প্রতি ওই গাইড লাইন আপডেটও করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৬৭৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। তবে ২০১৬ সালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ ভালোই ছিল। শুধু আগষ্ট মাসেই ১৪শ’ ৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলো। ওই বছর ১৪ জনের মৃত্যু ঘটে। যা দেশের ডেঙ্গুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এরপর থেকে রাজধানীতে এডিস মশার প্রজনন এলাকা সনাক্ত করে মশা নিধনের জন্য জরিপ কার্যক্রম শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত মে মাসে করা এক জরিপে দেখা যায় রাজধানীর উত্তর সিটি কপোরেশনে এডিস মশার ঘনত্ব ঝুঁকি ছিলো ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ঢাকা সিটির দক্ষিণ অংশে এ হার ছিলো ৩২ দশমিক ৮৪। জুলাই মাসে তা ৪০ এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে উত্তরের গুলশান-১’ এ এডিস মশার ঘনত্ব ঝুঁকিমাত্রা-৭০, মিরপুর-১১’ এ ৬০, মোহাম্মদপুর, মনিপুরিপাড়া, নিকেতন, গাবতলী এবং লালমাটিয়ায় ৪০ শতাংশ। যদিও এডিস মশার ঘনত্ব ঝুঁকির সহনীয় মাত্রা ২০।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ডেঙ্গু মশার ঘনত্ব বিবেচনায় ভর মৌসুম সেপ্টেম্বর মাস ব্যাপি ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগাম বর্ষা বা যখন তখন থেমে থেমে বৃষ্টি বা আবহাওয়াগত পরিবর্তনের জন্য এডিস মশার বংশ বিস্তারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর তথ্য মতে রাজাধানীর ৭টি এলাকা অতিরিক্ত ডেঙ্গু প্রবণ। এগুলো হলো- ধানমন্ডি, কলাবাগন, কাঠালবাগান, হাতিরপুল, পান্থপথ, বনশ্রী এবং রামপুরা। ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার তথ্য মতে, রাজধানীতে আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীরা ১৩টি সরকারি হাসপাতালে এবং ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। তবে ঢাকার বাইরে অন্য কোন বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

ডেঙ্গু প্রসঙ্গে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর ইনকিলাবকে বলেন, আক্রান্তের পর যেসব রোগীর ডেঙ্গু হেমরেজিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাদের শরীরে আগে থেকেই ডেঙ্গু ইনফেকশন বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ তারা এর আগেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, আক্রান্তের ৫দিনের মধ্যে এনএসএ পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়া যাবে। উৎসঃ ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ