প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় ঠিকই কিন্তু জানে না কিছুই

শামীম সুলতানা : বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। যিনি শিক্ষা দিয়ে থাকেন, তিনি হলেন শিক্ষক। আর শিক্ষক কথাটির অর্থ শি Ñ শিষ্টাচার, ক্ষ – ক্ষমাশীল, ক- কর্তব্যপরায়ণ।  সত্যবাদী, শিক্ষিত, সক্রিয়, চরিত্রবান, সৎ, উদ্যোমী, দায়িত্ববান।

তাই বলা যায়, শিষ্টাচার, ক্ষমাশীল, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যবাদী, শিক্ষিত, সক্রিয়, চরিত্রবান, সৎ, উদ্যোমী ও দায়িত্ববান ব্যক্তিই হলেন শিক্ষক। অন্যভাবে বলা যায়, শিক্ষাদানের মহান ব্রত যার কাজ, তাকেই শিক্ষক বলে। শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগর বলা হয়। কেননা, একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায়নীতি দীক্ষা দিতে। শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকে স্বার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরাম্বিত করেন স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করে তাদেরকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। একজন আদর্শ শিক্ষক তিনিই, যার শিক্ষা ও স্মৃতি দীর্ঘকাল শিক্ষার্থীর মনে গেঁথে থাকে। একজন অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক যেকোন বিষয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রদান করেন। কঠিনকে সহজ করে দেখান। এ বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করা। আগ্রহের সীমানা টেনে না দেয়া।

একজন শিক্ষককে প্রথমে একজন  ভালো মানুষ হতে হবে। তাকে হতে হবে বিবেক সম্পন্ন মানবিকগুণের অধিকারী। তার ব্যক্তিত্ব হবে এমন যেন তার আদর্শে একজন শিক্ষার্থী তার জীবনকে উজ্জীবিত করতে পারে। আগেকার দিনের শিক্ষকরা যেমন ছিলেন। যাদের কাছে বর্তমান শিক্ষকরা পড়ে এসেছেন। তখনকার শিক্ষকদের প্রধান ব্রত ছিল কিভাবে একটি দূর্বল ছাত্রকে ভাল করে তোলা যায়। প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী যেন সঠিক জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে পারে। তারা ছাত্র-ছাত্রীদের দূর্বলতার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন। যদি আর্থিক কারণেও কেউ পড়ালেখায় মনোযোগী হতে না পারত, অনেক শিক্ষক আর্থিকভাবেও সাহায্য করেছেন ছাত্র-ছাত্রীদের।

অথচ, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ শিক্ষক দুটো মারাত্মক ভুল করেন। ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেন। নিজেকে ছাত্রের অবস্থানে না নামিয়েই পড়াতে থাকেন। একজন ছাত্র না বুঝলে বা কম বুঝলে শিক্ষকরা অনেক সময়ই রেগে গিয়ে বলে ফেলেন, এই সহজ কথাটা বুঝছো না কেন? তুই একটা ফাঁকিবাজ ছেলে ইত্যাদি।  কিন্তু সেই শিক্ষক কি এক্ষেত্রে একটিবারও ভেবে দেখেছেন যে, কথাটা কতটা অপমানজনক? এই কথাটা যদি কোন কারণে প্রকাশ্যে তাকেই  বা সেই শিক্ষককে কখনো হজম করতে হয়, তাহলে তার নিজের কাছে কেমন লাগবে? আবার একজন শিক্ষক পড়াতে গিয়ে মাঝে-মাঝে হয়তো ভুলে যান যে, তার সামনে যারা বসে আছে তাদের কাছে তার কথা বোধগম্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ, তিনি হয়তো ছাত্রদের লেভেলে না নেমে তার লেভেলে থেকেই পড়িয়ে যান।

এক্ষেত্রে শিক্ষকরা হয়তো ভুলেই যান যে, তিনি নিজেও একসময় ছাত্র ছিলেন। আমার মতে, একজন শিক্ষকের সবসময় মনে রাখা উচিত, একজন ছাত্রের ইন্টেলেকচুয়াল লেভেল আর তার নিজের লেভেল এক নয় এবং সেই সাথে তার এটাও মনে রাখা উচিৎ, সবার ইন্টেলেকচুয়াল লেভেল বা ধারণক্ষমতা এক হয় না। আমাদের শিক্ষকদের বৃহত্তর অংশ শিক্ষকতা পেশায় আসেন কেবল জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে। পেশাটির প্রতি ভালবাসা ও গভীরভাবে পেশাটাকে মহিমাম্বিত করার উৎসাহ বা আগ্রহ তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। এক সময় বলা হতো, শিক্ষক হলো মানুষ গড়ার কারিগর। বর্তমান সময়ের শিক্ষকদের মধ্যে নেই কোন আত্মসম্মানবোধ, নেই নৈতিকতাবোধ, নেই শিক্ষার প্রতি গুরুত্ববোধ, নেই নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। তাদের এখন একটি-ই লক্ষ কিভাবে টাকা আয় করা যায়।

ছাত্র-ছাত্রীরা পড়া বুঝল কি বুঝল না তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। রাস্তায় তাদের দেখে ছাত্র-ছাত্রী সালাম দিল কি দিল না তাতে কোন মাথা ব্যথা নেই। মাথা ব্যথা শুধু কত বেশি টাকা আয় করা যায়, কিভাবে বাড়ি বানানো যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। শিক্ষকদের এরূপ পড়ানোর কারণে, ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের থেকে ভাল কিছু শিখছে না। এর প্রকৃত প্রমাণ বর্তমান সময়ের এসএস.সি এবং এইচএস.সি পরীক্ষায় পাশকৃত শিক্ষার্থীরা। যারা কোচিংবাজ শিক্ষকদের কাছে নির্ধারিত সিলেবাস পড়ে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় ঠিকই কিন্তু জানে না কিছুই। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না।

শিক্ষকদের নৈতিকতাহীনতার কারণেই আজ জাতি ধীরে ধীরে মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। কোচিং করায় দেখে সরকার অনেককেই বদলীর ব্যবস্থা করেছেন। এতে করে তাদের কোচিং করানো আরো বেড়ে গেছে। বলে আমি নিজ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে পারব না, এখনতো আর আমি এই স্কুলের শিক্ষক নই। তাই আমার ছাত্র-ছাত্রী পড়াতেও কোন বাঁধা নেই। তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। টিভি ক্যামেরা তাদের কাছে জানতে চায় ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং করানো হয় কেনো? তাদের জবাব, যে বেতন পাই বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার চলে না। সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ, যে সকল শিক্ষকগণ ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিংয়ে আগ্রহী তাদের অবসরের ব্যবস্থা করে শিক্ষিত বেকারদের চাকুরীর সুযোগ করে দেয়া হোক।

তারা স্কুলের চাকুরীতে বহাল থেকে রমরমা কোচিং ব্যবসাও চালিয়ে যায়। তাতে করে দেশে শিক্ষিত বেকারের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত যুবকেরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে অকালে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। কোন কোন শিক্ষক প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে। তাদের নৈতিকতাহীনতার কারণেই আজ জাতি মেধাশূন্য হয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।

পরিচিতি : আইনজীবী/ মতামত গ্রহণ : নৌশিন আহম্মেদ মনিরা/ সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত