প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকারের ভিত্তি শক্ত হলেও সমস্যা সর্বগ্রাসী দুর্নীতি

ডেস্ক রিপোর্ট : রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলটি এবং এর নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাও বজায় রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে দলটির কৃতিত্বের যে স্বীকৃতি জনমনে রয়েছে, পরবর্তী নির্বাচনে তার সুফল আওয়ামী লীগ পাবে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আইআরআই।

সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যা এবং বর্তমান সরকারের দুর্বল দিকগুলো কাজে লাগিয়ে সপক্ষে জনমত সংগঠনে সমর্থ হয়নি সরকারবিরোধী দলগুলো। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রধান শর্ত—নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবির প্রতি মানুষের সমর্থন এখন মাঝারি পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা সামনের নির্বাচনে সরকারবিরোধী দলগুলোর দুর্বল অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ‘বাংলাদেশ : ডেইলি চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে জনমতের প্রতিফলন রয়েছে। গত বছর দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ‘ফোকাস গ্রুপ’ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বয়স, রাজনৈতিক মত ও অর্থনৈতিক অবস্থার নারী-পুরুষের মতামত নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে, যা প্রকাশ করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার।

বিগত (২০০৭-০৮) তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এ ধরনের সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের দাবিকে দুর্বল করেছে বলে মনে করে আইআরআই। তাদের ২০১৪ সালের জানুয়ারির জরিপে ৭৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছিল। ২০১৭-র এপ্রিলে এ হার নেমে দাঁড়ায় ৫৬ শতাংশে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, অনেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর্তৃত্বপরায়ণতা ও সন্ত্রাসের যোগসূত্র অনুমান করে। এ দাবির সমর্থন কমে যাওয়ায় বিএনপির স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, কারণ দলটি নির্বাচনে যাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এ ধরনের সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।

জরিপের ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা দুর্নীতিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, দুর্নীতির কারণে দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে সমস্যায় ভুগছে মানুষ। অনেকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তবে এ জন্য সরকারের চেয়ে বেশি দায়ী করেছে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রশাসনকে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় মতামতদানকারীদের মধ্যে। তা সত্ত্বেও আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার আশা করেছেন তাঁরা।

স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা ও বর্তমান উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা।

বিএনপি ও দলটির নেত্রী খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা ব্যক্ত করেছেন আলোচকদের বেশির ভাগই। আলোচনায় তুলনামূলকভাবে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে আইআরআই।

সংস্থাটির মতে, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মতামত নিয়ে আলাপ-আলোচনায় ভীতির কথা জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। তাঁরা মনে করেন, গণতন্ত্র পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে কাজ করছে না। নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক মতই ছিল বেশি। তবে এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের প্রশংসাও ছিল আলোচনায়।

ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় উঠে আসা মতামতের ভিত্তিতে আইআরআই মনে করে, উল্লেখযোগ্য উন্নতির পরও বাংলাদেশের মানুষ আর্থিক কষ্ট, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যায় প্রতিনিয়ত ভুগছে। তবু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্জিত সাফল্য ও নেতৃত্বের জনপ্রিয়তার কারণে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শক্ত রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে সন্ত্রাস, একগুঁয়েমি ও ধর্মীয় উগ্রবাদের সংগে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কারণে নির্বাচনী বছরে কঠিন সময়ের মুখোমুখি রয়েছে বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াত।

ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে শহরে ও গ্রামে ১৬টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় নারী ও পুরুষ অংশগ্রহণকারীরা আলাদাভাবে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। প্রতিটি গ্রুপে অন্তত একজন করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সদস্য ছিলেন। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ১৯টি মূল প্রশ্ন ছিল তাঁদের কাছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের। আর দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব খাতকেই গ্রাস করা দুর্নীতি তাদের কাছে অন্যতম প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশের আটটি বিভাগে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আইআরআইয়ের জরিপে এ চিত্র উঠে আসে।

গত বৃহস্পতিবার এ জরিপের ফল প্রকাশ করে সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ডেরেক লুইটেন বলেন, জরিপে দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য সরকারকে দোষারোপ করেননি। বরং তাঁরা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে সমালোচনা করেন।

গত ছয় বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশের বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে ২০১৬ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১ শতাংশ। তবে এ প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না বলে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন। জিনিসপত্রের চড়া দাম, সম্পদের বৈষম্য ও সুযোগের অপ্রতুলতার কারণে তাদের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি ও বিদ্যুত্-সেতুসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণে আওয়ামী লীগের সাফল্যের প্রশংসা ছিল অনেকের মুখে। ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করেননি কেউ।

আলোচনায় দুর্নীতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, দুর্নীতি বাংলাদেশে সর্বব্যাপী। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই দুর্নীতির কথা জানান অংশগ্রহণকারীরা। আইআরআই মনে করে, অবারিত দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে। নির্বাচন ও রাজনীতিকে ঘিরে দুর্নীতির প্রসার ঘটলে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস হারাবে সাধারণ মানুষ।

জালিয়াতি ও সন্ত্রাসের কারণে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে আলোচনায়। চট্টগ্রামের এক নারী জানান, স্থানীয় এক নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তিনি দেখেন তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। বরিশালের একজন জানান, তাঁর কেন্দ্রে বিরোধী দলের কেউ ছিল না।

অন্য মতও দিয়েছেন কেউ কেউ। ময়মনসিংহের এক নারী জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। এখন তাঁরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছেন।

তবে গণতন্ত্র ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ় আগ্রহ ফুটে উঠেছে আলোচনায়। আইআরআইয়ের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৬ শতাংশই জানিয়েছে. আগামী নির্বাচনে তারা ভোট দিতে আগ্রহী।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিকটিও উঠে এসেছে আলোচনায়। ছিনতাই, সড়ক দুর্ঘটনা, মাদক, শিশু পাচার ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। ঢাকার একজন বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে স্বীকার করছি, নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। চট্টগ্রামের এক নারীর অভিযোগ, সুযোগ পেলে যেকোনো স্থানেই নারীর গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছে। ধর্ষণের চেয়ে ধর্ষণের ঘটনার প্রমাণ করতে যাওয়া বেশি পীড়াদায়ক। প্রতি মিনিটে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অথচ উকিলরা জিজ্ঞেস করেন, কোথায় টাচ করেছে, তোমার সঙ্গে কী করেছে?

প্রতিবেদনে আইআরআই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগণের কাছে পৌঁছাতে হলে ব্যাপকভাবে স্থানীয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তি নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত