প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পা নেই তো কী, আছে স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘অনেক দিন গ্যাপ হয়ে গেছে। সময় কম। একটু পড়তে হবে,’ বলেই বইয়ে মনোযোগ রুবিনা খাতুনের (২৩)। আর কয়েক দিন পরেই তাঁর অনার্স চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা। সারাক্ষণ বই আর হাতে তৈরি নোট নিয়ে ব্যস্ত তিনি। এই ব্যস্ততা রুবিনাকে যেন ভুলিয়ে দিয়েছে তাঁর দুটি পা নেই! এখনো তাঁর ঠিকানা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শয্যা।

দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া মেধাবী এই মেয়ে প্রায় তিন মাস ধরে হাসপাতালে। আর্থিক টানাপড়েন আর মানসিক সংকটের কারণে একদিন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো অবস্থায় রেললাইন অতিক্রম করছিলেন রুবিনা। তখন ট্রেনে কাটা পড়ে দুটি পা হারান তিনি। সংগ্রামী এই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকসহ আরো কিছু হৃদয়বান মানুষ।

রুবিনার স্বজন ও শিক্ষকরা জানান, এরই মধ্যে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) কৃত্রিম পা স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি রুবিনাকে পুনর্বাসনের উদ্যোগও নিয়েছেন শিক্ষকরা। আগামী মাসেই রুবিনার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। তাঁর যেন শিক্ষাজীবনে কোনো বিরতি বা সমস্যা না হয় সেদিকটাও নজর রাখছেন শিক্ষকরা। তবে লেখাপড়ায় প্রবল আগ্রহী রুবিনা নিজেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৬৭ নম্বর কেবিনে গিয়ে দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে-বসে লেখাপড়া করে যাচ্ছেন রুবিনা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরীক্ষার শেষে যদি একটি চাকরি পেতাম তাহলে খুবই ভালো হতো। চাকরির পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি নিতাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘রেলমন্ত্রীর দেওয়া কৃত্রিম পা পাচ্ছি। তবে সেটা যদি আরো ভালো মানের পা হতো তাহলে আরো ভালো হতো। আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাররা পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁরা সব সময় খোঁজখবর নিচ্ছেন। আমার সহপাঠীরা নিয়মিত আসে।’

এক প্রশ্নের জবাবে রুবিনা বলেন, ‘ডাক্তাররা বলেছেন, ওই পা দিয়ে আমি হাঁটতে পারব। কাজও করতে পারব। পরিবারকে দেখাশোনাও করতে পারব।’

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার শান্তিনগর গ্রামের প্রয়াত রবিউল ইসলামের মেয়ে রুবিনা। চার বছর আগে দিনমজুর বাবার মৃত্যুর পরও অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। মেধাবী রুবিনার বড় বোন জুলেখা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। একমাত্র ভাই রুবেল। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। টিউশনি করে লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিবারকে সহায়তাও করতেন রুবিনা। চার বছর ধরে একটি শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছিলেন, যা গত ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়ে যায়। নিজের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েন রুবিনা। শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন। গত ২৮ জানুয়ারি বাড়ি যাওয়ার জন্য কমলাপুরে টার্মিনালে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান রুবিনা। এরপর ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগেরর অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘রুবিনা এখন অনেকটাই সুস্থ। রেলমন্ত্রী মহোদয়ের সহায়তায় পা স্থাপনের জন্যই তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। মে মাসে রুবিনার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। সে যেন স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরতে পারে সে জন্য আমরা সর্বাত্মক সহায়তা করছি। সহযোগিতার জন্য রুবিনার সহপাঠীদের নিয়ে একটি টিমও গঠন করে দেওয়া হয়েছে।’

পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তার জন্য ইতিমধ্যে ১০-১২ লাখ টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচের জন্য সমাজকর্ম বিভাগের ১৪ জন শিক্ষক প্রতি মাসে নিজেদের বেতন থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে দেবেন। সামান্য টাকায় তো জীবন চলবে না। ওর চাকরি বা স্থায়ী কিছু হলেই প্রকৃত অর্থে পুনর্বাসন হবে।’

হাসপাতালে মেয়ের পাশে আছেন রুবিনার মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের পাশে না দাঁড়ালে আমাদের পরিবারটা ভেসে যেত। মন্ত্রীও সাহায্য করেছেন। আমরা গরিব মানুষ। জানি না কিভাবে, কী পা লাগানো হয়। আমার মেয়েটা যেন চলতে পারে। জানি না মেয়ের কোথায় বিয়ে দিব। কী করে মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাব।’ রহিমা বেগম জানান, গত সপ্তাহে সিএমএইচে রুবিনার পা স্থাপনের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর মাপ নেওয়া হবে। সূত্র : কালের কণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত