প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জামায়াতের বিচারে উদ্যোগ নেই

শুভ : স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সংগঠনটি প্রকাশ্যেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের বিচার নিয়ে সব মহল সোচ্চার থাকলেও তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান দলসহ একাধিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও হয়তো ভোটের রাজনীতির কারণে জামায়াতের বিচার এখন হিমাগারে। কবে নাগাদ এই সন্ত্রাসী সংঠনের বিচার শুরু হবে, এখনও পর্যন্ত তা অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে।

বিশিষ্টজন বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হয়েছে। এখন দলের বিচার প্রয়োজন। সে জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে অধীর অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা বলছেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। জামায়াত দেশে ও দেশের বাইরে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে। নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। জামায়াতের বিচার না হলে ৩০ লাখ শহীদের পরিবার ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচন করতে পারবে, কোন দল পারবে না, সেটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল নিয়ে যেহেতু সর্বোচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন, সেহেতু এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।

এ নিয়ে কথা হয় সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, প্রচলিত আইনে জামায়াতের বিচার করতে কোনো বাধা নেই। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছেন। এরপর তারা (জামায়াত) এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকা ওই আপিল নিষ্পত্তি হলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। আপিল শুনানির বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

আইসিটি অ্যাক্টস সংশোধন করা হলে জামায়াতের বিচার করা যেতে পারে বলে মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সমকালকে তিনি বলেন, আপিল বিভাগে একটি আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। সেটা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সমকালকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াত গণহত্যাসহ ন্যক্কারজনক মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচার অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না, তাদের এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি, জামায়াতকে সর্বস্তর থেকে প্রত্যাখ্যান করা হোক।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার রয়েছেন। তিনি সমকালকে বলেন, ২৬ বছর ধরে আমরা জামায়াতের বিচারের দাবি করে আসছি। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হয়েছে, এখন সন্ত্রাসী দল জামায়াতের বিচার করতে হবে। দেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কেন তাদের বিচার হচ্ছে না, তা সরকারকেই বলতে হবে। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না, তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্বিচারে গণহত্যা করেছে, সেই সন্ত্রাসী দলের বিচার না হওয়ায় ৩০ লাখ শহীদ পরিবারের সদস্যরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। জামায়াত ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে। তারা দেশের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ সমকালকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিশাল একটি সন্ত্রাসী দল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চলছে। এ দলের বিচার করার জন্য সার্বিকভাবে একটা প্রস্তুতির দরকার। সে ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা প্রস্তুত। যে মুহূর্তে আইসিটি আইন (অ্যাক্টস) সংশোধন হয়ে আসবে, সেই মুহূর্তেই বিচারের পক্ষে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করব। তিনি বলেন, ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এখন একটি সন্ত্রাসী দলের বিচার করতে হলে নানা কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন।

তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিবসহ ২৫ জনের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রশন) অবৈধ ও কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদসস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ ২০১৩ সালের ১ আগস্ট এ রায় দেন। এর আগে একাধিকবার তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এসব সংশোধনীতে দলের নাম ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ করা হয়।

উচ্চ আদালতের এ রায়ের পর নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দলটির নিবন্ধন বাতিল ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিলেও জাতীয় নির্বাচনে দলটি আর অংশ নিতে পারেনি। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে জামায়াত। গত পাঁচ বছর চলে গেলেও সেই আপিলের শুনানি শুরুর উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি।

সংবিধান অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। র?াজনৈতিক বিশ্নেষক ও গবেষকরা মনে করেন, আগামী নির্বাচনের আগেই জামায়াতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে অবিলম্বে আইসিটি অ্যাক্টস সংশোধন করে জামায়াতকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

রাজাকারের শিরোমণি যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের আমির গোলাম আযমের মামলার রায়ে জামায়াতকে একটি ‘ক্রিমিনাল সংগঠন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, জামায়াত অপরাধী সংগঠন। একাত্তরে তাদের ভূমিকা ছিল দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। এরপর বিভিন্ন মহল থেকে দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের দাবি জোরালো হয়ে উঠলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে। এরপর জামায়াতের বিচার করতে সরকারের পক্ষ থেকে আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হলেও গত চার বছরেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিচারের ক্ষেত্রে যেসব স্থানে ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে, সেসব স্থানে অর্গানাইজেশন বা সংগঠন শব্দ জুড়ে দিয়ে আইনটি সংশোধন করা হলে বিদ্যমান আইনে যেভাবে ব্যক্তির বিচার করা সম্ভব হচ্ছে, একইভাবে অভিযুক্ত কোনো সংগঠন বা দলেরও বিচার করা সম্ভব হবে। এ নিয়ে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মন্ত্রিসভার নীতিগত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আটকে আছে জামায়াতের বিচার। তবে পাকিস্তানে দু’বার এবং ভারতে চারবার সাময়িক নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল জামায়াত। ১৯৮৬ সালে প্রথম বাংলাদেশে নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি।

গত ৫ মার্চ সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিসিএস ইকোনমিক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘জামায়াত দেশের শত্রু। তাদের এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই।’ তবে জামায়াতকে নিষিদ্ধের বিষয়টি জটিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়। এরপর থেকে ‘যুদ্ধাপরাধী দল’ হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। একে একে ৭২ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ হয়েছে। তবে দল হিসেবে জামায়াতের বিচার করা হচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াত-শিবির জনগণের মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে। রাষ্ট্র ও মানুষের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে আসছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে। তাদের সাম্প্রতিক সময়ের তৎপরতা সংবিধানপরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজ মনে করেন, জামায়াতের অতীত ও বর্তমান তৎপরতা সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্তের পরিপন্থী হওয়ায় রাজনৈতিক দল হিসেবে এ দল নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা যায়।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের (গ) ও (ঘ) উপ-অনুচ্ছেদ, রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল্‌স অর্ডিন্যান্স ১৯৭২ ও দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮-এর বিধিবিধান অনুসরণ করে যে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিষিদ্ধ করা যায়। দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮-এর ৩ ও ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ববিরোধী কার্যকলাপ করতে পারবে না। কোনো রাজনৈতিক দল সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে গোপন তৎপরতা চালাতেও পারবে না।

জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক থাকলেও বর্তমানে এ নিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে তারা। তাদের মতে, যেহেতু জামায়াত নিষিদ্ধের প্রশ্নটি আদালতে বিচারাধীন, সেহেতু আদালতের রায় অনুযায়ীই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ায়ই যুক্তিযুক্ত। এতে করে বিতর্ক এড়ানো যাবে, তেমনি বহির্বিশ্বের চাপও মোকাবেলা করা সহজ হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক সমকালকে বলেন, জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করেছে তদন্ত সংস্থা। তবে এর বিচার কী কারণে আটকে আছে, তা আমরা জানি না। প্রথমে বলা হলো, সংগঠনের বিচারের বিধান নেই, আইন সংশোধন করতে হবে। সেটাও করা হলো। এখন কী কারণে তা আটকে আছে, তা জানা নেই। যদি পুনঃতদন্তের প্রয়োজন হয়, সেটা তো আমাদের বলতে হবে। সূত্র : সমকাল

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত