প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মিয়ানমারের তাড়াহুড়ো নিয়ে সন্দেহ

তারেক : নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তির দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। গত ২৩ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে এ দ্বিপক্ষীয় ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই মাস অর্থাৎ মঙ্গলবারের মধ্যে এসব রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হওয়ার কথা।

এই চুক্তি বাস্তবায়নে এসব রোহিঙ্গা কীভাবে ফেরত পাঠানো হবে, তা চূড়ান্ত করে গত ১৬ জানুয়ারি আরেকটি চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ। এই ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সম্মত হওয়ার সময় থেকে দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। মিয়ানমারও চাইছে আগামীকাল থেকেই প্রত্যাবাসন শুরু হোক। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওইদিন প্রথম দফায় ৭৫০ জন মুসলমান ও ৫০৮ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় দেশটি। মিয়ানমার সরকার এরই মধ্যে তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথম দলে তাদের রাখতে মিয়ানমার বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে।

মিয়ানমারের এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, কেবল বিশ্বকে দেখানোর জন্যই চুক্তির দুই মাস পূর্ণ হওয়ার দিন নামমাত্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া শুরু করতে চায় মিয়ানমার। কেননা মুখে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বললেও কীভাবে তাদের পরিচয় যাচাই করেছে, তা স্পষ্ট করছে না দেশটি। এর আগে মিয়ানমার একতরফাভাবে হিন্দু রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ শুরুতেই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রত্যাবাসনে অসম্মতি জানিয়েছে। বরং বাংলাদেশ এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিবারভিত্তিক তালিকা তৈরি করে নেপিডোকে দেবে। মিয়ানমার সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

এমনকি প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বিষয়টি প্রত্যাবাসন

প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, গত সপ্তাহের শেষ দুই দিনে শতাধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়ায় এসেছে। গত শনিবারও এসেছে প্রায় ৫৫ জন রোহিঙ্গা। এমনটি ঘটতে থাকলে রোহিঙ্গারা যেতে চাইবে না বলে জানান শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম।

বাংলাদেশ চাইছে প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেই প্রত্যাবাসনে যেতে, যাতে মাঝপথে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া থেমে না যায়। ফলে তাদের ফেরত পাঠাতে আরো এক থেকে দেড় সপ্তাহ লাগতে পারে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বাংলাদেশ চায়, প্রথম দিন থেকেই প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০০ জনের প্রত্যাবাসন শুরু করা এবং পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা বাড়ানো। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। এর জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে স্বাক্ষরিত ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি অনুযায়ী একেকটি পরিবারকে একক ইউনিট ধরে একটি ফরমের খসড়া প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ। দু-এক দিনের মধ্যে খসড়াটি মিয়ানমারে পাঠানো হবে। মিয়ানমার এটি চূড়ান্ত করে ফেরত পাঠালে একক ইউনিট নির্ধারণের কাজ শুরু হবে। প্রক্রিয়া শেষ করে এই ফরম পূরণের কাজ শুরু করতেই আরো এক সপ্তাহের বেশি লাগবে।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া পর্যন্ত সংশয় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। শুরুতে ফেরত যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের সংখ্যাও কম থাকবে। কারণ যেভাবে নির্যাতন করে তাদের তাড়ানো হয়েছে তাতে ফেরতে এখনো অনেকে আগ্রহী নন। বাংলাদেশকে ভালোভাবে মনিটর করতে হবে বিষয়টি। কিন্তু মিয়ানমার যদি তার অঙ্গীকার রাখে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করে, তা হলে ফিরতে আগ্রহী রোহিঙ্গার সংখ্যা বাড়বে।

মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) ইমদাদুল ইসলাম বলেন, শুরুর দিকে দৈনিক ৩০০ করে সপ্তাহের ৫ দিনে ১৫০০ রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয় মিয়ানমার। চুক্তিতে তিন মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করে এই সংখ্যা বাড়ানোর অপশন বা সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার যেন কোনো ছলচাতুরির সুযোগ নিতে না পারে। কারণ তারা চাইবে না সব রোহিঙ্গা ফেরত যাক। আন্তর্জাতিক চাপ যত দিন অব্যাহত থাকবে; তত দিনই মিয়ানমার নমনীয় থাকবে।

এদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করলেও এ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। নিজ ভূমিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র পল ভ্রিয়েজ। তিনি বলেছেন, শুধু নিরাপদ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসনই নয়, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। চলমান সামরিক অভিযানের মুখে এখনো অনেকে রাখাইন ছেড়ে পালাচ্ছে। শতাধিক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে এবং আরো আসছে।

এমন অবস্থায় কবে থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হতে পারেÑজানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়া উচিত। কিন্তু সম্ভব নয়। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে না হলেও ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কারণ আমরা স্বেচ্ছায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে চাই। খুব শিগগিরই রোহিঙ্গাদের তালিকা দেওয়া হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক এবং ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট সই অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি বিস্তারিত জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আন্তরিক পরিবেশে’ অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আর ২০১৬ সালের অক্টোবরের পরে এসেছে ৮৭ হাজার। গত কয়েক দশকের বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকায় রয়ে গেছে। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছে। তবে নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে সই হওয়া চুক্তি মতে, ২০১৬ সালের পর আসা রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার। এমন রোহিঙ্গার সংখ্যা ৭ লাখ। বাকিদের বিষয়ে ফের আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য একটি ফরমও চূড়ান্ত করা হয়েছে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে। ঠিক হয়েছে, পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের কাজটি হবে প্রতিটি পরিবারকে একটি ইউনিট ধরে। অনাথ ও ‘অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায়’ জন্ম নেওয়া শিশুদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, সীমান্তের পাঁচটি ট্রানজিট ক্যাম্প খুলবে বাংলাদেশ। সেখান থেকে তাদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে রাখা হবে মিয়ানমারের দুটি ক্যাম্পে। পরে সাময়িকভাবে তাদের থাকার ব্যবস্থা হবে হ্লা পো কুংয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পে। পাশাপাশি ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ভিটামাটিতে দ্রুততার সঙ্গে বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা নেবে মিয়ানমার। প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে থাকা কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. সুফিউর রহমান বলেছেন, প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন ৩০০ করে সপ্তাহে এক হাজার ৫০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। এই ব্যবস্থার অধীনে একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হবে অর্থাৎ একটি ফরমে পুরো পরিবারের তথ্য থাকবে এবং মিয়ানমার এটি গ্রহণ করবে। ফলে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাবে এবং মিয়ানমার তাদের সময়মতো বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশে আর না আসে, তার ব্যবস্থা করবে মিয়ানমার। প্রতিদিনের সংবাদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত