প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিক্ষকরা সভ্যতার ধারক বাহক

মোহাম্মদ আবু নোমান : একজন সফল মানুষের পেছনে শিক্ষকের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। শিক্ষক শুধু সফল নয়, একজন ভালো মানুষ হতে শেখান। শিক্ষকদের ভূমিকার স্বীকৃতিস্মারক হিসেবে ১৯ জানুয়ারি ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’টি গুরুত্বের সাথে পালিত হয়েছে। শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক। শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানই করেন না, তিনি মানুষ গড়ার কারিগরও।সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের অবস্থানের যে পরিবর্তন হয়েছে তা অকল্পনীয়, অভাবনীয়। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের ঈদ বোনাস, উৎসব ভাতাসহ শতভাগ জাতীয় পে-স্কেলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এত সুবিধার পরও একজন শিক্ষকের অমনোযোগিতা ও যোগ্যতার অভাবে শিক্ষাদানের কার্যটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। শিক্ষকদের ভুলে গেলে চলবে না, তারা জনগণের টাকায় গড়া স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।

এখন তারা কর্মজীবী হিসেবে জনগণের টাকায় মাসিক বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। তাই এখন শিক্ষকদের নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে। তারপরেও বলতে হয়, সরকারি চাকরি সাথে মান-মর্যাদার অনেক ক্ষেত্রে এখনো অসামাঞ্জস্য ও অসম বৈষম্য রয়েছে। স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকদের আজও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।শিক্ষকতার পেশায় নৈতিকতা খুবই জরুরী। নীতি-নৈতিকতা বোধ জাগ্রত না হলে কারো পক্ষে এ মহান পেশায় থাকা ঠিক নয়। শিক্ষকরাই জাতির মেরুদ-। কথাটি যথার্থ, সময়োপযোগি ও ন্যায়সঙ্গত মনে হলেও প্রশ্ন থাকে কোন শিক্ষক? অবশ্যই আদর্শ শিক্ষক। একজন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য হবেÑ ছাত্রদের যেকোনো সমস্যায় ভালভাবে বোঝানোর ক্ষমতা বা দক্ষতা। কথায় ও কাজে, পোশাক ও রুচিতে, পেশায় ও কর্তব্য পালনে শিক্ষক হবেন আদর্শবান, ধর্মপ্রাণ, সত্যপ্রিয় অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। শিক্ষক হবেন রোল মডেল বা আদর্শ, জ্ঞানের উৎস, আনন্দের ভা-ার। অর্থাৎ একজন শিক্ষক হবেন চতুর্মুখী প্রতিভার অধিকারী। তাই তাকে হতে হবে আর দশটি মানুষের তুলনায় সেরা।

সহশিক্ষার সুযোগে ক্লাসমেট এমনকি পিতৃতূল্য কতিপয় শিক্ষক নামধারী পরিমল মার্কা নরপশু ছাত্রীদের ধোকাবাজি ও গুপ্ত প্রেম-ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে দৈহিক সুখ লুটার সুযোগে থাকে। শিক্ষক-শিক্ষিকা বাবা-মায়ের সমান। বাবা ও মার পরেই যে ব্যক্তিটি শিশু-কিশোরদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন তিনি হলেন- শিক্ষক। অথচ সেই শিক্ষকনামধারী কতিপয় লম্পট, চরিত্রহীন, নরপশু দ্বারাই আজ বিভিন্নভাবে নিগৃহ হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক হেলাল প্রাইভেট পড়ানোর কৌশলে ছাত্রীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে ছবি তোলা ও পরে ওই ছবি দেখিয়ে তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে যৌন নির্যাতন চালানো। পান্না মাস্টার যিনি দেড়শ ছাত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে ভিডিও করেছে বছরের পর বছর ধরে। ছাত্রীর নগ্ন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে দিনাজপুরে এক স্কুল শিক্ষককে গ্রেফতার ইত্যাদি।

পরিতাপের বিষয়, আজ শিক্ষাদানকে সেবা নয় বাণিজ্য হিসেবেই দেখছে অনেকে। তাই এদেশে শিক্ষার মানের উন্নতি না হয়ে হচ্ছে অবনতি। এখন প্লে শ্রেণিতে পড়া একটি বাচ্চাকেও গৃহশিক্ষক দিতে হয়। ছোট বড় সব ক্লাশের নোট/গাইডে বাজার সয়লাব। বাছাই করে দেয়া গাইডের প্রশ্নই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে হুবহু তুলে দেয় শিক্ষকরা। জানা যায়, প্রতিটি নোট/গাইডের প্রকাশকরা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছরই মোটা অংকের টাকা দিয়ে থাকে। এই ধরনের অনৈতিক শিক্ষকতার ফল কখনো সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না; যা ঘটার তাই ঘটছে। অন্তঃসারশূন্য জাতি গঠিত হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা মূল বই নির্ভর না হয়ে গৃহশিক্ষক ও গাইড নির্ভর হয়ে পরছে।

আগেতো শিক্ষা এতোটা বাণিজ্যিক ছিল না, শিক্ষকগণ এতো নীতিভ্রষ্ট ছিলেন না। তারাও অর্থ কষ্টে ভূগতেন, তাই বলে কখনো অর্থলোভী হতেন না। গড়ি-বাড়ির স্বপ্নও তারা দেখতেন না। সততা, সরলতা ও সব কিছুতেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে চলতেন, তারা ছিলেন আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক। তাদের পায়ে জুতা ছিল না; খালি পায়ে দীর্ঘ পথ হেটে তারা স্কুলে আসতেন। সব সুবিধা নাই এর মাঝে থেকেও ছাত্রদের আকর্ষণ ছিল শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রচ- ব্যক্তিত্ব ও ভালবাসা। তাদের মাঝে ছিল আবেগ মিশ্রিত কথাবার্তা, শিক্ষায় উৎসাহ, উদ্বীপনা, একাগ্রতা, শিখানোর দৃঢ় প্রত্যয় ও প্রত্যাশা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-শিক্ষকদের মননে আজ জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে অর্থার্জনই বড়।

সাধনা, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাদান সবই এখন অপমৃয়মান। ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে প্রাইভেট পড়ানোর প্রতি অনেক শিক্ষকের আগ্রহ বেশি। অনেকে সরাসরি বলতে পারেন না। এ জন্য পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেন, অকারণে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিরূপ আচরণ করেন। অনেকে আবার সরাসরি বলেও ফেলেন। ক্লাসে ঠিকমতো না বুঝিয়ে প্রাইভেটে বোঝান-এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। প্রাইভেট পড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ছাত্র সংগ্রহ করতে স্কুলে আসা, এমন মনোভাব যাতে শিক্ষকদের মধ্যে গড়ে না ওঠে সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত