প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আশঙ্কাই সত্য হলো

তারেক :  ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপনির্বাচন ও সম্প্রসারিত ওয়ার্ডের সাধারণ নির্বাচনে আইনি জটিলতা নিয়ে আশঙ্কা ছিল নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ছিল একই ধরনের শঙ্কা। এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) বারবার বলে এসেছে, নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আইনি কোনও জটিলতা নেই। বিষয়টি আমলে না নিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। শেষ পর্যন্ত শঙ্কাই সত্যি হলো। এ বিষয়ে রিট হওয়ায় বুধবার (১৭ জানুয়ারি) উচ্চ আদালত ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচন ও সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডের সাধারণ নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করে আদেশ দিয়েছেন। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি এ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।

উচ্চ আদালতের আদেশের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা জানান, যে গ্রাউন্ডে আদালত আদেশ দিয়েছেন, সেই সমস্যার বিষয়টি তারা আগেই চিহ্নিত করেছিলন। কিন্তু সরকার ও কমিশন তা আমলে না নিয়ে তফসিল ঘোষণা করায় আজ এই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এতে করে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের জনগণ।

নির্বাচন স্থগিত হওয়ার জন্য নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা সরকার ও নির্বাচন কমিশন— দু’‘পক্ষকেই দায়ী করেছে। এক্ষেত্রে দু’পক্ষের যোগসাজশ রয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তারা। এদিকে সরকার নির্বাচন স্থগিতের জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর দায় চাপিয়েছে। অন্যদিকে, কমিশন বলেছে, আইনি বিষয়টি পর্যালোচনার পর কোনও সমস্যা হবে না বিবেচনায় নিয়ে তারা তফসিল ঘোষণা দিয়েছে।

দু’জন নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণার আগে  সঙ্গে আলাপকালে আইনি জটিলতার কথা স্বীকার করেছিলেন। একজন কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছিলেন, তারা আইনি জটিলতা রেখে তফসিল দিয়ে নিজেদের ঘাড়ে দায় নিতে চান না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আইনি জটিলতা রেখেই তফসিল দেওয়া হয়। তফসিল ঘোষণা করে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচনে আইনগত বাধা নেই।’

ইসি সূত্র জানায়, এই জটিলতা তৈরি হওয়া নিয়ে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও আশঙ্কা ছিল। গত ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার আগে এই নির্বাচন নিয়ে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের কার্যপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ভোটার তালিকা, নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ, নতুন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মেয়াদ সম্পর্কিত জটিলতাসহ ছয়টি বিষয় বিবেচনা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বৈঠকে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যে গ্রাউন্ডে রিট রয়েছে এবং আদালত আদেশ দিয়েছে, সেটা তো জেনুইন। আমরাও আগেই এগুলোর কথা তুলেছিলাম। কিন্তু তারা এর সুরাহা না করে কেন তফসিলে গেলেন।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন,‘এটা সরকারের ইচ্ছায় করেছে কিনা জানি না। বা আদৌ তারা নির্বাচন চায় কিনা জানি না। যদি রাজনৈতিক মোটিভেশনে হয়, তাহলে আমার কিছু বলার নেই।’

ড. তোফায়েল বলেন, ‘যারা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন, তাদের মেয়াদ কতদিন হবে, তা আপনারা বলেননি। এই ওয়ার্ডগুলো সিটি করপোরেশনে যুক্ত হয়েছে ২০১৬ সালে। এত দিনে কেন এর ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা যায়নি। এগুলো না করে তারা কোন যুক্তিতে ভোটে গেলেন। সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটাও পরিষ্কার নয়। এগুলো স্পষ্ট না করে আধাখেচড়াভাবে নির্বাচনে গিয়েছে।’

বিষয়টির জন্য সরকার ও কমিশন উভয়কে দায়ী করে এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যেটা হয়েছে তার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন দু’পক্ষেরই দায় রয়েছে। তাদের এই বিষয়গুলো আগেই ঠিক করে নেওয়া উচিত ছিল।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারিত ওয়ার্ডগুলোর নির্বাচন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকার ও কমিশন দুপক্ষই উদ্যোগ নিয়ে আইনি জটিলতা মোকাবিলা করে দ্রুত ডিএনসিসি’র উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেবে বলে আশা করছি।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসেন বলেন, ‘ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে ৩১ জানুয়ারি। নতুন যারা ভোটার, তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে। তেমনি তাদের প্রার্থী হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। কাজেই এর আগে তফসিল ঘোষণা করা সঠিক হয়নি। আর এ কারণে আদালতের আদেশকে আমি সঠিক বলেই মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘কমিশন যদি নির্বাচন করতে আন্তরিক হয়, তাহলে তাদের উচিত হবে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত প্রকাশের পর তার সিডি প্রকাশ করা। এরপর আদালতকে অবহিত করে ভোটের উদ্যোগ নিতে পারে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালতের আদেশে ভোট স্থগিত হয়ে গেল। এর জন্য কে দায়ী? সরকার নাকি নির্বাচন কমিশন? জানতে চাই, কেন মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হলো?’

তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনও ওই কথাটি রিপিট করছি, সরকার ও কমিশন আগে থেকে উদ্যোগী হলে আজকের সমস্যায় পড়তে হতো না। বিষয়টি নিয়ে আমি গণমাধ্যমে নিবন্ধও লিখেছি। এর সমাধানের পরামর্শও আমি সেখানে বলেছি।’ অবশ্য আদালত চাইলেও একটি সমাধান দিতে পারতেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ডিএনসিসির নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রকারান্তরে নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট কেন নির্বাচন স্থগিত করেছেন তা আমি জানি না। বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। তবে লোকমুখে শুনেছি, ভোটার লিস্ট সম্পন্ন হয়নি এবং সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি।’

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন করা ইসির দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার থেকে এসব নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ পেয়েছে ইসি। সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনও বাধা নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।’

উৎসঃ বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত