প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে কূটনীতি

ডেস্ক রিপোর্ট : বিদায়ী বছরটি শুরু রোহিঙ্গা বিষয়ক কূটনৈতিক কার্যক্রম দিয়ে। শেষও হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় উদ্যোগের মধ্যদিয়ে। কিন্তু জানুয়ারি মাসের সূচনায় নবাগত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরতের আলোচনা হলেও বছরের সমাপনীতে সেই সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি আরও ৬ লাখ ৫৫ হাজার। মানবিক কারণে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দিলেও তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বছরব্যাপী তৎপরতা চালিয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন- রোহিঙ্গা কূটনীতিতে বাংলাদেশ বছরব্যাপী তৎপরতা চালালেও মিয়ানমার এবং তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কূটচালের কারণে এখনও কাঙিক্ষত ফল আসেনি। মিয়ানমারে বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে নতুন করে আসা সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা নাগরিকের বোঝা এখন বাংলাদেশের ঘাড়ে।

আগে থেকে থাকা চার লাখ যোগ হয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখে। আগস্ট থেকে হঠাৎ রোহিঙ্গা ঢলে চরম এক মানবিক সংকটে পড়ে বাংলাদেশ। কেবল মানবিকতাকে পুঁজি করে বুক আগলে বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বাহবা কুড়িয়েছে পুরো বিশ্বের। রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশংসা কুড়িয়েছেন বিশ্ব নেতাদের। যদিও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কায় চিন্তিত সবাই। অবশ্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। জানুয়ারি শেষ হওয়ার আগেই প্রত্যাবাসন শুরুর কথা। এ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানবিক পরিচয়টা বৈশ্বিক অঙ্গনে বাড়তি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান মতে, নবাগত ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা ছাড়াও গত অক্টোবরের পর আসা ৮৭ হাজার, নিবন্ধিত শরণার্থী ৩৩ হাজার এবং অনিবন্ধিত প্রয় ৩ লাখ মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন প্রায় ১১ লাখ আশ্রয়ে রয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে বিশ্বে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় অংশ এখন বাংলাদেশে। তাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সক্রিয় থাকলেও এ নিয়ে অনিশ্চতা কাটছে না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গাদের ফেরানোর জন্য রাখাইন এখনও প্রস্তুত নয়। তাদের ফেরার পথে প্রথম বাধা নিরাপত্তা। এবারে সেখানে যে নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছে রোহিঙ্গারা, তা সব সময় তাদের তাড়িয়ে ফিরছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যে ভয়াবহ নৃশংসতা জেনারেল মিন অং লায়েংয়ের নেতৃত্বে হয়েছে, সেটা জেনারেল নে উইনও কল্পনা করতে পারেন না। সেনাবাহিনী তো রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে এখনো স্বীকারই করছে না। তা ছাড়া সেখানে যে গুরুতর মানবিক সংকট হয়েছে তারও কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি নেই মিয়ানমারে। রাখাইনের এবারকার হত্যা, ধ্বংসে সেনাবাহিনীর দোসর হয়েছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খল একদল লোক। দ্বিতীয়ত: রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে কীভাবে তাদের জীবন চলবে সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। রোহিঙ্গারা তাদের আদিনিবাসে ফিরতে চায়।

তাদের অবাধ চলাচল, কাজে যাওয়ার সুযোগ, বিশেষ করে ফসলের ক্ষেতে, মাছ ধরতে জলাশয়ে যেতে চায় তারা। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসার হামলার পর সান্ধ্য আইন জারির ফলে রোহিঙ্গাদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ চরমভাবে কার্যকর রয়েছে। অথচ রাখাইনের দীর্ঘদিনের জীবনাচারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীরা মুসলিম কৃষক ও জেলেদের কাছ থেকে পণ্য কিনতেন। সেখানকার অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে রোহিঙ্গাদের বড় ভূমিকা ছিল। আগস্টের সহিংসতার পর দীর্ঘ কয়েক দশকের সামাজিক নির্ভরশীলতার এই সম্পর্কও এ মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে।

তৃতীয়ত: রাখাইনের ভবিষ্যৎ। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের বঞ্চনা রয়েছে সেখানে। সেই বঞ্চনা থেকে উগ্রবাদ মাথা চাড়া দিতে পারে। ফলে এই পরিস্থিতিতে শান্তিপ্রিয় রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরতে কতটা প্রস্তুত? বাংলাদেশ তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গেও কাজ করেছে। এ নিয়ে ২৩শে নভেম্বর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করা ছাড়াও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার কাউন্সিলে বেশ কয়েকবার ভোটাভুটি, বৈঠক ও আলোচনার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে।

এ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় কাউন্সিলেও প্রস্তাব উঠেছে। তবে রোহিঙ্গাসংকটে বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশ তার কাছের বন্ধু ভারত, চীন ও রাশিয়াকে যেভাবে পাশে পেতে চেয়েছিল, সেভাবে পায়নি। গুরুত্বপূর্ণ এই তিন দেশের মধ্যে জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আর ভোট দেওয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে ভারত। যদিও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সহায়ক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে সেখানে প্রি ফেব্রিকেটেড হাউস তৈরির জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে ভারত। উল্লেখ্য, বছরব্যাপী রোহিঙ্গা কূটনীতিতে বাংলাদেশে রেকর্ডসংখ্যক ইনকামিং ভিজিট হয়েছে। রোহিঙ্গাসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক আউট গোয়িং সফরও হয়েছে। তবে বছরব্যপী কূটনৈতিক উদ্যোগেও বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হয়নি। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত