প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাঙালির স্বাদের পিঠা- মজার পিঠা

এলড্রিক বিশ্বাস : পিঠা আমাদের জীবনে একটি মুখরোচক খাদ্য। বড়দিনসহ বিভিন্ন পার্বণে, উৎসবে পিঠা একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য সামগ্রী। পিঠা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পার্বণেরও অংশ। বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-তাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর বসবাস। সকলেই উৎসবে মেতে উঠে বিভিন্ন পর্বে ও রীতিনীতিতে। বাংলাদেশে যারা বসবাস করে তাদের পরিচয় বাঙালি হিসেবে। এদেশের সকল মানুষ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পালন করে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। ফসল কাটার উৎসব অর্থাৎ বৈশাখ ধান কাটার উৎসব বা নবান্ন উৎসব হিসেবে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। তদ্রুপ আদিবাসী বা নৃ-তাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর ফসল কাটার উৎসব ওয়ানগালা যা ফসলের প্রাপ্তিতে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য পালিত হয়। পিঠা, পায়েস, খৈ, মুড়ি এসকল খাদ্য সামগ্রী পার্বণে অতিথি আপ্যায়নে প্রয়োজন হয়। নবান্ন উৎসবের প্রধান আয়োজনে থাকে পিঠা। বাংলাদেশে হরেক রকমের পিঠা তৈরি হয়। কিছু প্রচলিত পিঠা আমরা হরহামেশা খেয়ে থাকি।

আবার কিছু বিদেশি পিঠা (পর্তুগীজ/স্পেন) বংশ পরস্পরায় তৈরি করি যা এখন আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে মিশে গেছে। শুভ বড়দিন, শুভ পুনরুত্থান, পহেলা বৈশাখ ও ওয়ানগালা উৎসব এদেশের খ্রিস্টভক্তদের পার্বণ উদযাপনের অংশ। সাধারণত ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, কুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা সবার কাছে কম-বেশি পরিচিত।
পিঠা বিষয়ক লেখাটা তৈরি করার উদ্দেশ্য বিভিন্ন ধরনের পিঠার সাথে আমরা যেন পরিচিত হই। বর্তমানে ফাস্ট ফুডের মায়াজালে ও আকর্ষণে চলমান প্রজন্ম পিঠাকে ভুলেই যাচ্ছে। বৈশাখ মাসে বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার মানসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় থাকে মুড়ি-মুকরীর সাথে পিঠার সমাহার। আমাদের দেশে আমরা প্রায়শঃ দেখি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকে পিঠা প্রদর্শনের আয়োজন। এটি একটি ভাল দিক যেখানে দেশিয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। আমরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি। প্রকৃতি বিয়য়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আয়োজন করা হয় উক্ত মেলার। সৃষ্টিকর্তা পিতা ঈশ্বরের সৃষ্টি সবই উত্তম। ঈশ্বরের সৃষ্ট উপকরণ ব্যবহার করে জীবন-যাপন করছে মানুষ। আবার মানুষ প্রকৃতিকে নষ্ট করে বিশ্বকে করছে উতপ্ত। প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না। আমাদের বসবাসযোগ্য পৃথিবী আজ হুমকীর মুখে?

১৪১৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সাভারে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানটি ছিল কৃষ্টি, প্রকৃতি বিষয়ক মেলা বা প্রদর্শনী। প্রকৃতি থেকে যে উপকরণ পাই তা আমরা ব্যবহার করি খাদ্য হিসেবে। প্রাকৃতিক খাদ্য খেজুরের রস বা গুর, তালের রস, কাঠালের রস ব্যবহিত হয় পিঠা তৈরিতে। একটি স্টলে দেখেছিলাম হরেকরকম পিঠার প্রদর্শনী। তৈরিকৃত প্রতিটি পিঠার সাথে লিখে দেওয়া হয়েছে পিঠার নাম। পিঠা বানাতে প্রয়োজন হয়েছে চালের গুড়ি, চিনি, লবণ, তেল, হাতের কাজ। পিঠার মধ্যে ছিল- ভাঁপা পিঠা, তালের পিঠা, কুলি পিঠা, সাজ পিঠা, পাটি সাপ্টা পিঠা, চিরুনী পিঠা, কেক, সিরিঞ্জ পিঠা, ঝিকমিক পিঠা, ফুল পিঠা, পাতা পিঠা, শামুখ পিঠা, ঝুরা পিঠা, বোরা পিঠা, ফিলিস পিঠা, বিরিঙ্গা পিঠা, বিন্নি ধানের খৈ, ফোস্কারাম, নিমকি, ডোনাট, নাড়–, বাতাসা ইত্যাদি। এছাড়া আরও অনেক পিঠা আছে যা গ্রাম বাংলায় অনেকর প্রিয়। শতাধিক পিঠার নাম পাওয়া যাবে যা আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য। বাংলার লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ এ পিঠা শহুরে জীবনে যতই ফ্যাশনেবল বা আর্টিফিশিয়াল হোক, এর শেকড় গ্রামে। গাঁয়ের মাটির গন্ধেই পিঠার মৌ মৌ সুবাস।
শীতের শুরুতে প্রকৃতিতে হালকা কুয়াশা নেমে আসতে না আসতেই শহরের রাস্তার ধারে এবং গ্রামের হাটে বাজারে ভাপা পিঠা বিক্রি শুরু হয়। আটা নারিকেল গুড় পরিমাণ মতো বাটিতে ভরে পাতলা কাপড়ে মুড়ে পাতিলের ওপর বসিয়ে আগুনের তাপে পানির বাষ্প উঠে তৈরি হয় ভাপা পিঠা। এই ভাপা পিঠার স্বাদেই শীতের পিঠাপুলির দুয়ার খুলে দেয়।

কয়েকটি পিঠা হল- ভাঁপা পিঠা, পোয়া পিঠা, পাকান পিঠা, ফুল পিঠা, ঝাল পিঠা, ভেজিটেবল পিঠা, গোলাপ পিঠা, লবঙ্গ পিঠা, ছাঁচ পিঠা, লতিকা পিঠা, সন্দেশ, পানতোয়া পিঠা, রসফুল পিঠা, নকশি পিঠা, পুডিং পিঠা, দুধরাজ পিঠা, চিতই পিঠা, চুটকি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, জামদানি পিঠা, মালাই পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, সুন্দরী পিঠা, পুলি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, সরভাজা পিঠা, দুধ পিঠা, জামাই পিঠা, আন্দশা পিঠা, কাটা পিঠা, বিবিখানা পিঠা, সাজ পিঠা, ডিম চিতইপিঠা, কাঁঠাল পিঠা, কাঁঠালপাতার পিঠা, খাস্তা পিঠা, গুড় পিঠা, চন্দ্রপুলি পিঠা, চাল পিঠা, ছানারপিঠা, ছড়া পিঠা, জামাইভোগ পিঠা, জালা পিঠা, ডোবা পিঠা, তিলকুলি পিঠা, দৈলা পিঠা, দুধকদু পিঠা, পাক্কাশ পিঠা, পাপড় পিঠা, বরফি পিঠা, বড়া পিঠা, মেরা পিঠা, মুগপাকন পিঠা, রুটি পিঠা, সেমাই পিঠা, ভাঁপা পুলি পিঠা, কলা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, চাপড়ি পিঠা, নারকেল পিঠা, পাটা পিঠা, মুঠা পিঠা, ছিটা পিঠা, গোকুল পিঠা, চুটকি পিঠা, চষি পিঠা, মালাই পিঠা, ফুলকুচি পিঠা, জামাইঠগ পিঠা, তাল পিঠা ছাড়াও আরো অনেক রকম বাহারি পিঠা রয়েছে। এতো রকমের লোভনীয় সুস্বাদু পিঠা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নফপযৎরংঃরধহহবংি.পড়স
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত