প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইবলিসের অবকাশ প্রার্থনা

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ: ইবলিস যখন দেখলো যে বিশ্বনিখিলের স্রষ্টার নির্দেশ অমান্য করা, গর্ব, দম্ভ ও আত্মম্ভরিতা প্রকাশ করা এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি অন্যায় আচরণের দোষারোপ করা ইত্যাদি অপরাধ তাকে রাব্বুল আলামিনের রহমতের দরবার থেকে বিতাড়িত করেছে এবং জান্নাত থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে, তখন সে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তওবা করার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলার কাছে এই দাবি জানালো যে, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন; এই দীর্ঘ সময়ের জন্য আমার আয়ুর রশি লম্বা করে দিন। মহান আল্লাহর হেকমতের চাহিদাও ছিলো এটাই। তাই তিনি ইবলিসের দাবি মঞ্জুর করলেন। এটা শুনে তখন আবার সে একবার তার শয়তানি স্বভাব প্রকাশ করলো। বলতে লাগলো, আপনি যখন আমাকে আপনার দরবার থেকে বিতাড়িত করেই দিলেন, তো যে-আদমের কারণে আমার কপালে এই অপমান ও লাঞ্ছনা জুটেছে, আমিও আদমের সন্তানদেরকে পথভ্রষ্ট করবো এবং তাদের পেছনে, সামনে, আশপাশে ও চারদিকে থেকে তাদেরকে বিপথগামী করবো। তাদের অধিকাংশকে আমি নাফরমান ও অকৃতজ্ঞ বানিয়ে ছাড়বো। তবে আপনার খাঁটি বান্দাগণ আমার আমার বিপথগামী করার তীরে ঘায়েল হবে না এবং তারা সবসময়ই সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। আল্লাহ তাআলা বললেন, তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই। আমার সৃষ্টির বিধান কর্মের বিনিময় ও কর্মের প্রতিফল সুদৃঢ় বিধান। যে যেমন কার্যকলাপ করবে সে তেমনই ফল ভোগ করবে। আর যে-আদমসন্তান আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে সে তোমারই সঙ্গে আল্লাহর শাস্তি জাহান্নামের উপযুক্ত হবে। যাও, নিজের দুর্ভাগ্য, অপমান ও লাঞ্ছনা নিয়ে এখান থেকে দূর হয়ে যাও এবং নিজের ও নিজের অনুসারীদের জন্য চিরস্থায়ী অভিশাপ জাহান্নামের অপেক্ষায় থাকো।

কুরআনুল কারিমের নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলো উপরিউক্ত বিশদ বিবরণের ওপর আলোকপাত করছে, তিনি বললেন, আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম, তখন কী তোমাকে নিবৃত্ত করলো যে তুমি সিজদা করলে না। সে বললো, (এই বিষয়টি আমাকে সিজদা করতে বারণ করলো যে) ‘আমি তার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; তুমি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছো আর তাকে সৃষ্টি করেছো কাদা দিয়ে। তিনি বললেন, এই স্থান থেকে নেমে যাও, এখানে থেকে অহংকার করবে তা হতে পারে না। (জান্নাতে থেকে অহংকার করার অধিকার তোমার নেই।) সুতরাং (এখান থেকে তুমি) বের হয়ে যাও, তুমি নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত। সে বললো, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত (যখন মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করে উঠানো হবে সেই সময় পর্যন্ত) আমাকে অবকাশ দাও। তিনি বললেন, যাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছে তুমি অবশ্যই তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে। (তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো।) সে বললো, তুমি আমাকে শাস্তিদান করলে, (তুমি যেহেতু আমার রাস্তা বন্ধ করে দিলে) এইজন্য আমিও তোমার সরল পথে মানুষদের জন্য নিশ্চয় ওঁত পেতে থাকবো। তারপর আমি তাদের কাছে আসবই তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান ও বাম দিক থেকে (সারকথা, প্রত্যেক দিক থেকে) এবং তুমি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ (তোমার নেয়ামতের শোকর আদায়কারী) পাবে না। তিনি বললেন, তুই এই স্থান থেকে ধিক্কৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় বের হয়ে যা। মানুষের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে নিশ্চয় আমি তোদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবোই। [সুরা আ’রাফ : আয়াত ১২-১৮]

আল্লাহ বললেন, হে ইবলিস, তোমার কী হলো যে তুমি সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলে না? (তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিজদা করলে না?) সে বললো, (এটা আমার জন্য সম্ভব নয় যে) ‘আপনি গন্ধযুক্ত কর্দমের শুষ্ক ঠন্ঠনা মৃত্তিকা (শুষ্ক হয়ে খন্খন শব্দে বাজে এমন খামিরাবিশিষ্ট গারা মাটি) থেকে যে-মানুষ সৃষ্টি করেছেন আমি তাকে সিজদা করবার নই। তিনি বললেন, (আল্লাহ তাআলার নির্দেশ এলো, যদি অবস্থা এমনই হয়) তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, কারণ তুমি তো অভিশপ্ত; এবং কর্মফল দিবস পর্যন্ত অবশ্যই তোমার প্রতি রইলো লানত। সে বললো, হে আমার প্রতিপালক, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন। তিনি বললেন, যাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছে তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হলে, অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। সে বললো, হে আমার প্রতিপালক, আপনি যে আমাকে বিপথগামী করলেন তার জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে তুলবো এবং আমি তাদের সবাইকে (সত্যপথ থেকে) বিপথগামী করবো, তবে তাদের মধ্যে আপনার নির্বাচিত বান্দাগণ ছাড়া। (আমি জানি, তারা আমার ধোঁকায় আল্লাহ বললেন, এটাই আমার কাছে পৌঁছাবার সরল পথ (এটাই আমার সরলপথ, যা আমা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে) পথভ্রষ্টদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তারা ছাড়াআমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনোই ক্ষমতা থাকবে না; অবশ্যই জাহান্নাম তাদের সবারই প্রতিশ্রুত স্থান। (কিছুতেই এর অন্যথা হবে না) [সুরা হিজর : আয়াত ৩২-৪৩]

আল্লাহপাক আরো বলেন, স্মরণ করো, যখন ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করলো। (ইবলিস সিজদার জন্য সে মাথা নত করলো না।) সে বলেছিলো, আমি কি তাকে সিজদা যাকে আপনি কর্দম থেকে সৃষ্টি করেছেন? (আমি আমার চেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টিকে সিজদা করতে পারবো না।) সে বলেছিলো, আপনি কি বিবেচনা করেছেন, আপনি আমার ওপর এই ব্যক্তিকে মর্যাদা দান করলেন, যদি আমাকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেন তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়াতার বংশধরদেরকে অবশ্যই কর্তৃত্বাধীন করে ফেলবো। আল্লাহ বললেন, যাও, (তুমি তোমার নিজের পথ ধরো) তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, তবে জাহান্নামই তোমাদের সকলের শাস্তি, পূর্ণ শাস্তি। তোমার আহ্বানে তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে পারো পদস্খলিত করো, তোমার (সৈন্যসামন্তের) অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর মাধ্যমে তাদেরকে আক্রমণ করো এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরিক হয়ে যাও এবং তাদেরকে (বিভিন্ন ধরনের) প্রতিশ্রুতি দাও।’ শয়তান তাদেরকে যে-প্রতিশ্রুতি দেয় তা ছলনামাত্র (সরাসরি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়)। ‘নিশ্চয় আমার (একনিষ্ঠ) বান্দাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই (আল্লাহ তাআলাই) যথেষ্ট। [সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ৬১-৬৫]

আল্লাহপাক আরো বলেন, তিনি বললেন, হে ইবলিস, আমি যাকে নিজ হাতে (আমার কুদরতের হস্ত দ্বারা) সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কীসে বাধা দিলো? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে না-কি তুমি (তার থেকে) উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বললো, আমি তা থেকে শ্রেষ্ঠ। আমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা (মাটি) থেকে। তিনি বললেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত, এবং কর্মফল দিবস পর্যন্ত তোমার ওপর আমার লানত স্থায়ী হবে। সে বললো, হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে উত্থানদিবস পর্যন্ত (কিয়ামতরে দিন পর্যন্ত, যেদিন সব মানুষকে উঠানো হবে) অবকাশ দিন।’ তিনি বললেন, তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলে, অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। সে বললো, আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি তাদের সবাইকেই পথভ্রষ্ট করবো, তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে নয়। (তাদেরকে আমি পথভ্রষ্ট করতে পারবো না) তিনি বললেন, তবে এটাই সত্য, আর আমি সত্যই বলি, তোমার দ্বারা এবং তোমার অনুসারীদের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবোই। [সুরা সোয়াদ: আয়াত ৭৫-৮৫]

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ