ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন এলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শেখ পরিবারের প্রভাব এখনো কমেনি। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া, রাজনৈতিক বার্তা দেয়া এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এখনো শেখ পরিবারের সদস্যরাই প্রধান ভূমিকা রাখছেন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—দলের অধিকাংশ নেতাই এখনো পুরনো নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি ভূমিকাও রাখছেন।
বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরে গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনাও দিচ্ছেন তারা। সেই ধারাবাহিকতায় অনেকেই দেশে ফিরেছেন, আবার কেউ কেউ ফেরার চেষ্টায় রয়েছেন।
বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি পাঠিয়ে নানা বিষয়ে মতপ্রকাশ করেছেন। অনলাইনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেছেন তিনি। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দিল্লিতে সরাসরি বৈঠকও করেছেন। গত ২৩ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগের একটি সংবাদ সম্মেলনে তার রেকর্ড করা অডিও বক্তব্য শোনানো হয়। যদিও এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যায়নি। অনলাইন কোনো মাধ্যমে, ভিডিও কনফারেন্স বা কলেও তাকে দেখা যায়নি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত তিনজন দায়িত্বশীল নেতা দাবি করেছেন, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা নিয়মিত অনলাইনে মিটিং করছেন। যাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে সবাইকে দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতির নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগের অভিভাবক শেখ হাসিনা। দল তার নেতৃত্বেই চলেছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। দলটির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে দলীয় অবস্থান তুলে ধরছেন তিনি। পাশাপাশি অনলাইননির্ভর বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিগুলোতে যুক্ত থেকে নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনাও দিচ্ছেন। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও রাখছেন তিনি।
শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত না হলেও দলের অভ্যন্তরে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনিও ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে যান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রীসহ দলটির বহু নেতাকর্মী বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। সেখানকার নেতাকর্মীদের সমন্বয় করা এবং বিভিন্ন দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনে সরাসরি ভূমিকায় রয়েছেন শেখ রেহানা। এ কাজে নিজের সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিও সহযোগিতা করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। আর আগে থেকেই লন্ডন আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। এখানকার নেতাকর্মীরা শেখ রেহানা ও তার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে থাকেন।
আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) কার্যক্রম পরিচালনায় আগের মতোই প্রভাব রয়েছে শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির। প্রতিষ্ঠানটির সদস্যরা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও এর কার্যক্রম সরাসরি দেখভাল করছেন তিনি।
তবে সজীব ওয়াজেদ জয়ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও সিআরআইয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজ সিআরআইয়ের সদস্যরাই পরিচালনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী আশ্রয় নেন ভারতে। দেশটির রাজধানী দিল্লি ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়সহ বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। তবে সবচেয়ে বেশি অবস্থান করছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ও এর আশপাশ এলাকায়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল, শেখ পরিবারের সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ বহু দায়িত্বশীল নেতা কলকাতায় অবস্থান করছেন। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যক্রম সমন্বয় করছেন শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন।
কলকাতায় অবস্থানরত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা বলেন, ‘ভারতে অবস্থানরতদের বড় অংশই আমরা কলকাতায় আছি। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী দেশান্তরী হওয়ায় এখানে দলীয় চেইন অব কমান্ডটা কাজ করছে না। তাই সার্বিকভাবে শেখ হেলাল উদ্দিন রাজনৈতিক কার্যক্রম সমন্বয় করছেন। দলীয় নির্দেশনাগুলো ওনার মাধ্যমেই ডেলিভারি হচ্ছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি মো. ওসমান চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মোহাম্মদ বদিউল আলম জসিমকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করেছে সংগঠনটি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন শেখ পরিবারের অন্যতম সদস্য শেখ ফজলে শামস পরশ।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, দলীয় নির্দেশনা মেনে অনেক কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন। আবার অনেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মূলত ভেঙে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
দলটির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও শেখ হাসিনা কিংবা শেখ পরিবারের প্রতি তাদের আস্থার কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। বরং দলের ইতিহাসে সংকটের সময়গুলোতে এ পরিবারের নেতৃত্বই দলকে পুনর্গঠিত হতে সহায়তা করেছে—এমন ধারণা এখনো নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রবল।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে দলের যে অবস্থা সেখানে আমূল পরিবর্তন দরকার। তবে শেখ পরিবারকে বাদ দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব না।
আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আওয়ামী লীগে শেখ পরিবারের সদস্যদের প্রভাব থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। দলের নেতাকর্মীরা এ পরিবারের ওপর ভরসা করেই রাজনীতি করে। সূত্র, বণিকবার্তা