আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সামনে কিছু আসনে আধিপত্য বিস্তারের বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না বলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ কেবল তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিগুলোই হারাচ্ছে না, বরং দলটি এখন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
কয়েক দশক ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিজ নিজ শক্ত ঘাঁটি ধরে রেখেছিল। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দুই দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে সেই ভারসাম্য আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দলটি টানা তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচনে জয়লাভ করে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন, আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই ব্যাপক ব্যালট সিল মারার অভিযোগ ওঠে।
নির্বাচনী ব্যবস্থায় এই কারচুপির অভিযোগে বিএনপি কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারে ব্যালটে আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনগুলো হঠাৎ করেই সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান এই প্রতিবেদককে বলেন, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
তিনি বলেন, বিএনপির সামনে তাদের প্রথাগত দুর্গের বাইরেও জয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং দলের সামগ্রিক আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। তরুণ ভোটাররা এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ সাধারণত প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট পেত। এখন বড় প্রশ্ন, তাদের অনুগত ভোটাররা কী ভূমিকা পালন করবে। হাসানুজ্জামান যোগ করেন, এটি এখনও অনুমানের বিষয়।
গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।
১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে ১২টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ১৯৮৮ এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
অন্যদিকে বিএনপি ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচন বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে।
সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনগুলোতে ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, ভোলা, বরিশাল, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহের অন্তত ৬২টি আসনে আওয়ামী লীগ চারবার বা তার বেশি জয়ী হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি ছিল ২২টি আসন, যেখানে ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে (যেগুলো তারা বর্জন করেছিল সেগুলো বাদে) দলটি জয় পেয়েছে।
আসনগুলো হলো: গোপালগঞ্জ-১, ২ ও ৩, মাদারীপুর-১ ও ২, শরীয়তপুর-২ ও ৩, পটুয়াখালী-৩ ও ৪, বাগেরহাট-১, খুলনা-১, ফরিদপুর-১, সুনামগঞ্জ-৩, মৌলভীবাজার-৪, দিনাজপুর-৫, সিরাজগঞ্জ-১, জামালপুর-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-১, ময়মনসিংহ-১০, গাজীপুর-১ এবং বান্দরবান।
অন্যদিকে বিএনপি অন্তত ৩৩টি আসনে চারবার বা তার বেশি জয়ী হয়েছে (বর্জন করা নির্বাচন বাদে)। এর মধ্যে রয়েছে বগুড়া-৬ ও ৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ও ২, ফেনী-১, নোয়াখালী-১, নওগাঁ-৬, নাটোর-১, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-৬, মুন্সীগঞ্জ-৪, মানিকগঞ্জ-১ এবং ঢাকা-৭।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বৈরতন্ত্র ও লুটপাটতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণেই আওয়ামী লীগ এখন নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে। তারা জনগণের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি ভোটাধিকারও কেড়ে নিয়েছিল।
হাসানুজ্জামান বলেন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেশ অন্ধকার। দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে যারা সরকার গঠন করবে তাদের অবস্থানের ওপর।
বিএনপি ও জামায়াত যা বলছে: উভয় দলের নেতারা জানিয়েছেন, একসময়ের আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত আসনগুলোতে জয়ের লক্ষ্যে তারা বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের দুর্গে নিয়মিত প্রচারণার পাশাপাশি দলটি ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ জোরদার করছে। তাদের মতে, এসব আসনে ভোটার উপস্থিতির হার জয়ের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হবে।
একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, আমরা এই আসনগুলোতে কঠোরভাবে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দাবি জানাব। প্রশাসনকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে এবং কোনো বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পারেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জোটের প্রার্থীরা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রচারণা চালিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
মাঠপর্যায়ের চিত্র: ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে আসা ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের বার্তা তুলে ধরে তারা আওয়ামী সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। এটা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগে কিছু দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রচারণা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
জামায়াতের কৌশল সম্পর্কে গফরগাঁও উপজেলা ইউনিটের অর্থ সম্পাদক আরিফুল হক বলেন, আমরা আশা করি আওয়ামী সমর্থকরাও আমাদের পক্ষে ভোট দেবেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের ওপর হামলা, মামলা বা জমি দখলের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ‘উঠান বৈঠক’ করছেন। দলীয় সূত্র বলছে, অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তাকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এক বৈঠকে তিনি বলেন, শিবচরের উন্নয়নের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে হবে। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানি করা হবে না।
পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া আওয়ামী সমর্থক হিসেবে পরিচিত ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। একই আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী আব্দুস সোবহানও (খেলাফত মজলিস) স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
জাহান্দার আলী বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করা আওয়ামী নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া তাদের দায়িত্ব।
গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম আওয়ামী সমর্থকদের ভয় কাটিয়ে তাকে ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ আব্দুল হামিদ মোল্লা নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না।
গোপালগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী এম এম রেজাউল করিম বলেন, তারা দুর্গম গ্রাম ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নির্বাচনে আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করছেন।
ফরিদপুরে বিএনপি ও জামায়াত ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। বিএনপি প্রচার চালাচ্ছে যে তারা একটি ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল’, তাই সব প্রগতিশীল শক্তির সমর্থন তাদের পাওনা। অন্যদিকে জামায়াত জোর দিচ্ছে যে তারা গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো আওয়ামী কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা বা হয়রানি করেনি।
ভাঙ্গা উপজেলার একজন ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফরিদপুর-৪ আসনে সাধারণত আওয়ামী সমর্থকদের ভোট যে পায়, সেই জেতে। এখন যেহেতু অনেক স্থানীয় নেতা বিভিন্ন দলে যোগ দিচ্ছেন, সাধারণ সমর্থকরা তাদের নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, শক্তিশালী দুর্গগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রভাব কমেছে ঠিকই, কিন্তু ভোটারদের একটি অংশ এখনও দলের প্রতি অনুগত।
তার মতে, আওয়ামী ভোটাররা সম্ভবত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বেন। এক অংশ অন্য দলগুলোকে ভোট দেবে, কট্টরপন্থীরা হয়তো ভোট দিতেই আসবে না। আর তৃতীয় একটি অংশ ‘না ভোট’ খুঁজবে এবং সেটি না পেয়ে ব্যালটে একাধিক সিল মেরে ভোট নষ্ট করে দিয়ে আসতে পারে। উৎস: ডেইলি স্টার।