শিরোনাম
◈ ভারতের উপহার দেওয়া সাড়ে ৪ কোটি টাকার জীবন রক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্স এখন 'ভোটের গাড়ি' ◈ নারী টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি বিশ্বকা‌পের বাছাই‌য়ে পাপুয়া নিউ‌গি‌নি‌কে সহজেই হারালো বাংলাদেশ ◈ কট্টর ডানপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট কার্টার কোরআন পড়ে অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ (ভিডিও) ◈ এবার প্রবাসীদের বড় দুঃসংবাদ দিল সৌদি আরব ◈ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বেহাল দশা, ম‌্যাচ জিত‌লো আফগা‌নিস্তান ◈ নবম পে-স্কেলে বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের কতো শতাংশ, যা জানা গেল ◈ কীভা‌বে ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিএনপির 'বিস্ময়কর' জয় এসেছিলো ◈ ঠেলাগাড়িতে বসে নীরবে ভিক্ষা করে কোটিপতি, আছে বহুতল ৩ বাড়ি ও মারুতি সুজুকি গাড়ি ◈ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে হাঙরের হামলা, মৃত্যুর মুখে ২ তরুণ (ভিডিও) ◈ ইভ্যালির রাসেল-শামীমা আবারো গ্রেপ্তার

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী, ২০২৬, ১২:৩১ দুপুর
আপডেট : ২০ জানুয়ারী, ২০২৬, ০২:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

কীভা‌বে ১৯৯১ এর নির্বাচনে বিএনপির 'বিস্ময়কর' জয় এসেছিলো

এল আর বাদল : বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপির ক্ষমতায় আসা এখনো দেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় একটি বিস্ময় হিসেবেই অনেকের কাছে বিবেচিত, কারণ ওই নির্বাচনের আগে এই ধারণাই বেশি প্রকাশ পাচ্ছিলো যে–– আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

কারও কারও মতে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার দলত্যাগের কারণে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ছিল দুর্বল, সে তুলনায় আওয়ামী লীগ তখন সাংগঠনিকভাবে শক্তিধর ছিল। এ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে ওই নির্বাচনে যেভাবে বিএনপি পরাজিত করেছিলো, তা দেশের রাজনীতির গতিধারাই পাল্টে দিয়েছিল। ----- বি‌বি‌সি বাংলা

এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে কার্যত দ্বি-দলীয় রাজনীতির সূচনা হয়, পাশাপাশি ওই সংসদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

আবার সব দলের সম্মতির ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হলে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার যে ধারণা- তারও আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ হয়েছিলো ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনেই।

সেই ভোটে বিএনপির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন নেতা বলছিলেন, নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে দুই নেত্রী- শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দেওয়া ভাষণের পরপরই তারা আঁচ করতে পারছিলেন যে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বিএনপির অনুকূলে আসছে।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন যে, ওই ভাষণ ছাড়াও নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলটির নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে নিজেদের বড়াই বা দম্ভের বহিঃপ্রকাশ বিএনপিকে সুবিধা করে দিয়েছিল।

এছাড়া তখনকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোটের নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে 'আপসহীনতার ভাবমূর্তি'ই ওই নির্বাচনে দলটির বিস্ময়কর সাফল্যের মূল কারণ বলে তারা মনে করেন।

প্রসঙ্গত, এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। আর আওয়ামী লীগকে ৮৪টি আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়েছিল।

এছাড়া জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে ওই নির্বাচনে। পরে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন।

বিএনপি জয় আঁচ করতে পেরেছিলো?

বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে এটা বিশ্বাস করা অনেকটা কঠিন ছিল যে আওয়ামী লীগ হারিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারবে।

মূলত এর আগে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নয় বছরে দলটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সাংগঠনিক অবস্থা ছিল খুবই নড়বড়ে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, তখন তার কাছে মনে হয়েছিলো–– বিএনপি নেতারা বরং বিশ্বাস করছিলেন যে তারা শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলেই বসতে যাচ্ছেন।

"আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক বিস্তৃত ছিল। আর জেনারেল এরশাদ তার নয় বছরে বারবার বিএনপি ভাঙার চেষ্টা করেছেন। অনেক নেতাকে ভাগিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে বিএনপি আসলে অনেক জায়গায় প্রার্থীও ঠিকমতো দিতে পারেনি সেই নির্বাচনে। এসব কারণেই সবার মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে আওয়ামী লীগই জিতবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

ওই নির্বাচনে বিএনপির হয়ে ১৪০টি নির্বাচনী আসনের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন দলটির এখনকার স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি ওই নির্বাচনের পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে হওয়া মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয় তারা কোনোভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন কি-না কিংবা নির্বাচনের ফল দলের জন্য আসলেই বিস্ময় ছিল কি-না -এমন প্রশ্নের জবাবে মি. রায় বলেছেন, তারা নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক আগে থেকে 'ভালো বাতাস' পাচ্ছিলেন।

"অনেকের কাছে বিস্ময়কর ফল মনে হলেও আমরা যারা আসনভিত্তিক কাজ করছিলাম তারা কিছুটা উপলব্ধি করছিলাম যে পরিস্থিতি অনুকূল হচ্ছে। রেডিও টিভিতে দুই নেত্রীর ভাষণের পর ঢাকায় মূলত আওয়ামী লীগ উড়ে গিয়েছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকে বলে থাকেন যে, সেবার নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও আট দলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা বেশ সমালোচিত হয়েছিলো। বরং সেই তুলনায় বিএনপি ও সাত দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার ভাষণ প্রশংসিত হচ্ছিলো।

সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু অবশ্য বলছিলেন, তখন রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকসহ সবার ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগই জিতবে।

"মনে হচ্ছিলো আওয়ামী লীগই জিতবে। আসলে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব তখন কেউ সেভাবে আঁচ করতে পারেনি। পরে অনেক বিশ্লেষণেই বিএনপির জয়ের কারণগুলো উঠে এসেছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বিএনপির জয়ের ফ্যাক্টরগুলো কী ছিল

বিশ্লেষক ও রাজনীতিক সবাই মানছেন যে, পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনই ছিল দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যা একটি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নির্বাচনের সময় তখন ইত্তেফাকের একটি সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, "এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য এই যে -এই প্রথম এদেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতেছে এবং আশা করা চলে যে, ভোটাররা নির্ভয়ে-নিরুপদ্রবে নিজ ইচ্ছামত প্রার্থী বাছাইয়ে তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিবেন"।

আর নির্বাচনের পর দোসরা মার্চ দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিলো, "নির্দলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বহু আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ যাবত তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে এ ধরনের অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি"।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলছেন, আসলে ঠিকমতো সুযোগ পেলে মানুষ নিজের অজান্তেও সঠিক রায় দেয় এবং ১৯৯১ সালে ঠিক তা-ই ঘটেছিলো বলে তারা মনে করেন।

"এখানে বড় ফ্যাক্টর ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকায় তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তা আর শেখ হাসিনার দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মি. রায় জানান, নির্বাচনের চার দিন আগে ঘরোয়া এক বৈঠকে তারা জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক কথা বলেছিলেন মিসেস জিয়ার সাথে, তিনি সবাইকে আরও পরিশ্রম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

এছাড়া বিশ্লেষকদের মতে, সেবার নির্বাচনী প্রচারণায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতার ভাষা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছিলো। এর বিপরীতে খালেদা জিয়া মূলত ভারতবিরোধী বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিলেন।

দৈনিক ইত্তেফাক তার একটি বক্তব্যের শিরোনাম করেছিলো, "বাংলাদেশকে বিদেশীদের গোলামীর চুক্তিতে আবদ্ধ করিতে না চাহিলে ধানের শীষে ভোট দিন"।

গয়েশ্বর রায় দাবি করছেন, শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর ঢাকার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলো।

এছাড়া সেসময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এমন কেউ কেউ মনে করেন, ড. কামাল হোসেন ও মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ কিছু দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামী লীগেরই একটি প্রভাবশালী অংশ অবস্থান নেওয়ার প্রভাবও পড়েছিলো পুরো নির্বাচনী ফলাফলে।

"আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা শুনে তখন মনে হতো যে তারা ক্ষমতায় এসে পড়েছে। এটি মানুষ ভালোভাবে নেয়নি," বলছিলেন মি. রায়।

১৯৯১ সালের ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বরগুনার একটি আসন থেকে জিতেছিলেন নূরুল ইসলাম মনি। পরে ১৯৯৪ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন।

"তখন যারা মোটামুটি বয়স্ক ভোটার তাদের বেশিরভাগই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল। আবার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় করেছিলো। এছাড়া নির্বাচনে আগে শেখ হাসিনার কথাবার্তাও সমালোচিত ছিল। আমার মনে হয় বিএনপির বিস্ময়কর জয়ের কারণ এগুলোই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়