মহসিন কবির: জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জোটের রাজনীতি বেশ সরগরম। বিএনপিতে অন্য দলে নেতাদের যোগদান ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আটটি রাজনৈতিক দলের জোটে আরো দুই দল যোগদান করেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে নির্বাচন বেশ জমজমাট হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন আটটি রাজনৈতিক দলের জোটে নতুন যুক্ত হওয়া দল দুটি হলো কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ কথা জানান।
আট দলীয় জোটের আয়োজনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জোটে যুক্ত হওয়া নতুন দুটি দলের নাম ঘোষণা করেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আরও কয়েকটি দল এই জোটে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও বর্তমান বাস্তবতায় আর কাউকে সঙ্গে নেয়া যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে নয়টি দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও এনসিপি আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে নতুন এ জোটে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে বলে জানান জামায়াত আমির। জোটের কে কত আসন পাচ্ছে সে ব্যাপারে এখনও কিছু চূড়ান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।
আগে থেকে জোটে থাকা আট দল হলো–বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
তবে গণমাধ্যমে কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় নাম প্রকাশ না করে এনসিপির ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছেন, সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে জামায়াতের সঙ্গে জোট-সমঝোতার পক্ষে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ৯০ শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ৮০ শতাংশ নেতা মত দিয়েছেন। ফলে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সমঝোতার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গতকাল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদের বরাবর ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ও দলীয় মূল্যবোধের আলোকে সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তিসংক্রান্ত স্মারকলিপি’ দেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ সদস্য। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ও এক ধরনের প্রচার চালিয়ে ৩০ জন একমত হতে পেরেছেন। তবে চিঠিতে সই থাকা একাধিক নেতা বলেন, তারা চিঠির সঙ্গে একমত নন। মৌখিক কথা বলে তাদের নাম যুক্ত করা হয়েছে।
যে কারণে জামায়াত-এনসিপি সমঝোতা: বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হলেও জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে এগিয়েছে এনসিপি। আজ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শুরুর দিকে এনসিপির নেতারা খুব আগ্রহ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছেন। ফলে গত কয়েক দিনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার আলোচনায় গতি আসে এবং দুই দলের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিষয়টি ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। কোন কোন আসনে দুই দলের কোন কোন প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা বেশি, সেটি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী আসন সংখ্যাও চূড়ান্ত হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। দলীয় প্রার্থী হতে হলে মনোনয়ন ফরমের সঙ্গে দলের প্রত্যয়নপত্রও জমা দিতে হয়। সেজন্য এই সময়ের মধ্যেই আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে সমঝোতা হলেও দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ার কারণে এ ব্যাপারে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে।
গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করে এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্য সচিব বলেন, তারেক রহমান দেশে আসার পরও এনসিপির সঙ্গে বিএনপির আসন সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় আগামী সংসদে জুলাই বিপ্লবীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা হয়।
এনসিপি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন জারা: এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা দল ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পদত্যাগের কথা জানান তিনি। পরে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার কথা জানিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন ডা. জারা। এছাড়া তার স্বামী দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি ব্যক্তিগত কারণে এনসিপি থেকে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোট বা আসন সমঝোতার আলোচনার মধ্যেই এমন সিদ্ধান্ত এলো। কয়েকটি সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতায় আপত্তি থাকায় পদত্যাগ করেছেন জারা। তবে ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির প্রার্থী হতে পারেন দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব হুমায়রা নুর।
ফেসবুক পোস্টে তাসনিম জারা জানান, আমার স্বপ্ন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের প্ল্যাটফর্ম থেকে সংসদে গিয়ে আমার এলাকার মানুষ ও দেশের সেবা করা। তবে বাস্তব প্রেক্ষাপটে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন হওয়ায় আজ রোববার থেকে স্বাক্ষর অভিযানে নামার কথা জানিয়েছেন জারা। তবে একদিনে এত মানুষের স্বাক্ষর নেওয়া অসম্ভব হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে আগ্রহীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য চেয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে আগামী সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ৪৭ লাখ টাকা গণচাঁদা সংগ্রহ করেছেন ডা. জারা। এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের কারণে অনুদান ফেরত নিতে চাইলে ফেসবুকে দেওয়া একটি ফরম পূরণ করার অনুরোধ করে জারা বলেছেন, আপনাদের ট্রানজেকশন আইডি ও ডিটেইলস ভেরিফাই করার পর অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। আর যারা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন, তাদের শিগগির জানাব কী প্রক্রিয়ায় আপনাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
ফেসবুকে সমঝোতার কারণ ব্যাখ্যা: গতকাল রাত সাড়ে ১২টার দিকে এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। সেখানে লেখা হয়, ‘ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গেই অন্য দলগুলোর মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সেখানে সংস্কারের পয়েন্টগুলোয় ন্যাচারালি (স্বাভাবিকভাবেই) এনসিপি, জামায়াত ও অন্য দলগুলো একমত হয়েছে।’
তিনি আরো লেখেন, ‘সেক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়, দেশকে নতুন করে গড়া, নতুনভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য যে রাজনীতি, সে রাজনীতির প্রতি যে কমিটমেন্ট সেটাকেই নির্বাচনি রাজনীতিতে জোটের বা সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে এটাকে মূল্যায়ন করছি।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমঝোতা মেনে নিতে না পেরে পদত্যাগ করেছেন আরেক নেত্রী তাজনূভা জাবীন। রোববার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ফেসবুক পোস্টে তিনি পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন।
এর আগে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে দলটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পদত্যাগের কথা জানান। তবে তিনি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল থেকে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সমঝোতায় গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সকালে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সামান্তা শারমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোনো সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি রাজনৈতিক জোট প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল নেতারা মন্তব্য করেছিলেন জামায়াতের জুলাইয়ের স্পিরিট, বাংলাদেশের নিয়ে পরিকল্পনা নিয়ে একমত হলে জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে আসতে পারে যেকোনো দল।’
এনসিপির এই নেত্রী বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির এত দিনের অবস্থান অনুযায়ী তার মূলনীতি, রাষ্ট্রকল্প জামায়েত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচন তথা সেকেন্ড রিপাবলিককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দল এনসিপি। ফলে এই তিনটি বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান যেকোনো রাজনৈতিক মিত্রতার পূর্বশর্ত।’