মহসিন কবির: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃতীয় শক্তির উত্থানের কথা বলা হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো বিএনপি ও আওয়ামী ও জামায়াতের বাইরে বড় শক্তি গঠন করা হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে গঠনের চেষ্টা হয়েছিলো বড় জোট। তবে এ প্রক্রিয়া শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ নেতাদের দলটির অন্তর্কোন্দলেই ভেস্তে যেতে বসেছে সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়া। এর পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা দুই ছাত্র উপদেষ্টার আপত্তি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানা গেছে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে লড়তে এনসিপির সঙ্গে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও ইউনাইটেড পিপলস অব বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছিল। পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের এতে যুক্ত হওয়ার কথা শোনা যায়। জোট গঠনের লক্ষ্যে চলছে আলোচনা। কিন্তু সমঝোতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এনসিপি ।
গত বুধবার এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি শীর্ষ নেতারা। সম্ভাব্য জোটে এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আপ বাংলাদেশ থাকলে সে জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করেন দলের অনেক নেতা। এ কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে জোট গঠন।
এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোটে যাওয়ার ব্যাপারে দলের মধ্যে দ্বিমত আছে। এর নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া দুই ছাত্রনেতা, যারা বর্তমান সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তারা আপ বাংলাদেশকে নিয়ে জোট গঠনে মোটেও রাজি নন। বরং তারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য জোটের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে আগ্রহী।
নতুন জোট গঠনের বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আপ বাংলাদেশ যেহেতু রাজনৈতিক দল নয়, সে কারণে আমরা তাদের সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী নই। তবে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য এনসিপি আরো কিছুটা সময় নিতে চায়।’
দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন বলেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে একমত হয়ে এনসিপি রাজনৈতিক জোট গঠনে আগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও চলছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট হতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে তারা জোট গঠনে আগ্রহী নন।
তিনি আরো বলেন, বুধবারের বৈঠকে অধিকাংশ সদস্য আপ বাংলাদেশের সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন।
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাহী কাউন্সিলে যেসব সদস্য নতুন জোটে যাওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন তারা প্রায় সবাই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের অনুসারী। তাদের অনুসারীদের পাশাপাশি আরো কয়েক সদস্য আপ বাংলাদেশের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করেন।
এনসিপি গঠনের আগে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের নিয়ে যে নাগরিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার প্রভাবশালী নেতা ছিলেন আপ বাংলাদেশের আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত। তারা এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে দল পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। এ কারণে এখন নতুন করে তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার বিরোধিতা করছেন এনসিপির অধিকাংশ নেতা । তবে অনেকে এ ব্যাপারে নমনীয় নীতি নেওয়ার পক্ষে।
হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করে এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের এক সদস্য বলেন, আপ বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধকে সামনে এনে তৃতীয় জোট গঠনের প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চলছে ।
তার মতে, দলের ভেতরে ও বাইরের প্রভাবশালী কেউ কেউ চান বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যেতে। তাদের অনেকে হয়তো চাইছেন না তৃতীয় কোনো জোট হোক।
জামায়াতের প্রার্থী হতে পারেন কৃষ্ণ নন্দী আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ গণমাধ্যমকে বলেন, তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গঠনের বিষয়ে প্রায় তিন মাস ধরে আলোচনা চলছে। আপ বাংলাদেশ যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আছে তা এনসিপি নেতাদের অজানা ছিল না। শেষ মুহূর্তে এসে এ ধরনের দাবি বিস্ময়কর। এর পরও জোট গঠনের ব্যাপারে দল আশাবাদী।
তৃতীয় জোট গঠনের অন্যতম উদ্যেক্তা ও এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু গণমাধ্যমকে বলে, ‘জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার রক্ষা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বিনির্মাণে যারা আগ্রহী তাদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। এই জোটে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য গুরুত্ব পাবে নাকি এবারের নির্বাচনি বোঝাপড়া গুরুত্ব পাবে-সেটা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি। এ কারণে কয়েকবার সময় পিছিয়েও আমরা ঘোষণা পর্যায়ে উপনীত হতে পারিনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘একটি দল আরো একটু সময় চেয়ে নিয়েছে। আরেকটি দলের যুক্ত হওয়ার বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। আমরা এখনো হাল ছাড়িনি। আশাকরি ভালো কিছু হবে।’