আহসান হাবিব: আমলা কিংবা সরকারি চাকরি করা লোক কেন কবি হতে পারে না? কারণ কবিদের সঙ্গত কারণেই বলা হয় সত্যদ্রষ্টা। একজন আমলা কখনো সত্যদ্রষ্টা হতে পারেন না। কারণ তার সামনে দণ্ডায়মান থাকে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র মানেই তার আদেশ মেনে চলা, তার পায়ের কাছে মাথা নত করা। একজন কবি কি কারো আদেশ মেনে চলতে পারে বা বাধ্য? না, কবি তা নয়। কবি চলেন সত্য ও সৌন্দর্য্য প্রকাশের নির্ভীক ব্রত নিয়ে। আর রাষ্ট্র চলে সত্যকে চাপা দিয়ে তার স্বার্থ হাসিলে ক্ষমতা প্রয়োগের পথে। তাই রাষ্ট্র যখন দেখে তার একজন কর্মকর্তা কবি হয়ে উঠছে, তখন তার উপর চোখ রাঙায়। একজন আমলা এই চোখ রাঙানিকে ভয় পায়, ভয়কে জয় করতে পার না, কারণ তাহলে তার আমছালা সবই যাবে।
এই যে রাষ্ট্রের মধু খাওয়া আমলা কেউ কেউ কবি হতে চায়, আসলে এরা হয় রাষ্ট্রের প্রশংসাকারী এক পদলেহী স্তাবক। এরা আগেকার দিনের দেবতা বা ঈশ্বরপূজারিদের মতো, শুধু শংসা রচনা করাই তাদের কাজ। অবশ্য নির্দোষ প্রকৃতি বর্ণনা এদের লেখায় বেশি পাওয়া যেতে পারে। ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’ এমন লাইন রফিক আজাদ বলতে পারেন, কিংবা ‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই, বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই’ এমন পঙ্তি কেবল মোহাম্মদ রফিকই উচ্চারণ করতে পারেন। এমন উদাহরণ অজস্র। একজন আমলা কবির পক্ষে কি এমন নির্ভীক সত্য উচ্চারণ সম্ভব? সম্ভব নয়।
[২] রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো কবি বা লেখক বা যে কোনো শিল্পীকে যদি পুরস্কার দেয় এবং তারা তা গ্রহণ করে ফেলে, তখন তাদের সত্য বলার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তারা তখন যা বলতে চায় সত্যের অনুরোধে, বলতে পারে না। তারা সমসময় চোখের সামনে রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান দেখতে পায় এবং থেমে যায়। এই থেমে যাওয়া মানবিক দুর্বল প্রবৃত্তি। একজন কবি এই প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে চলে যান সত্যের কাছে। সত্য মানে যা কিছু অসুন্দর, বিভেদমূলক, বৈষম্য সৃষ্টিকারী, শোষণমূলক তার বিরুদ্ধে উচ্চারণ। একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি বা শিল্পী এই উচ্চারণ করতে পারে না। ‘আমি সেইদিন হবো শাম্ত যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’ এই নির্ভীক উচ্চারণ কেবল নজরুল করতে পারেন, তাই তিনি কবি। ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে’ এমন সত্য এবং নির্ভীক উচ্চারণ কেবল লালনই করতে পারেন, তাই তিনি কবি। লেখক: ঔপন্যাসিক