দেবদুলাল মুন্না: হুমায়ূন আহমেদের ‘দরজার ওপাশে’ শুধু একটি বই থেকেই এটা প্রমাণ করা যায়। একগুচ্ছ উদাহরণ : [১] ‘টাকা থাকলে এই দেশে খুন কোনো ব্যাপারই না। এক লাখ টাকা থাকলে দু’টা খুন করা যায়। প্রতি খুনে খরচ হয় পঞ্চাশ হাজার। পলিটিক্যাল লোক হলে কিছু বেশি লাগে’। [২] ‘জাজ সাহেবদের টাকা খাওয়াতে হবে। আগে জাজ সাহেবরা টাকা খেত না। এখন খায়। অনেক জাজ দেখেছি কাতলা মাছের মতো হাঁ করে থাকে’। [৩] ‘বুদ্ধিমান লোক মাঝে মাঝে প্রথম শ্রেণির বোকার মতো কাজ করে। আমিও তাই করেছি। টাকা-পয়সা অনেক ব্যাংকেই ছিলো। ছিলো আমার নিজের নামে। কিছু যে অন্যের নামে রাখা দরকার, কিছু ক্যাশ দরকার এটা কখনও মনে হয়নি’।
[৪] ‘একটা বোকা লোক সব সরকারের আমলে মন্ত্রী হয় না। এক সরকারের আমলে হয়, অন্য সরকারের আমলে জেলে চলে যায়’। [৫] ‘পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ কঠিন জিনিস। শরীরের চামড়াটা শুধু থাকবে হাড্ডি, যা আছে পানি হয়ে পিসাবের সঙ্গে বের হয়ে যাবে’। আমাদের এও ভুলে গেলে চলবে না এক-এগারোর প্রবল দাপটের সময় হিমুর মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’-এর মতো সাহসী উপন্যাস। নানা দেশে বিশেষ বাহিনীর অত্যাচারের যে ধারা চালু আছে, তার বিরুদ্ধে হিমুকে দিয়ে প্রতিবাদ করিয়েছেন লেখক। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে যে কোনো মানুষই অসহায়। বিশেষ বাহিনীর কাছে আরও বেশি অসহায়। এদেরকে নিয়ে ঠাট্টার ছলে যে কাণ্ড হিমু করেছে তাতে সাধারণ মানুষের চাপা ক্ষোভের প্রকাশ পেয়েছে। একটি উদাহরণ: হিমুকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তিনজনের একটা টিম ঘামবাবু, হামবাবু ও মধ্যমণি, এই নাম দিয়ে পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করানো হচ্ছে। সেখানে ছড়া কাটছে হিমু:‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/র্যাব এল দেশে/সন্ত্রাসীরা ধান খেয়েছে/খাজনা দেব কীসে’? এটি ননসেন্স রাইম, যার কোনো মানে হয় না, আবার হয়ও। অথবা এই বইয়ের অন্যত্র, হিমুকে যখন ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে, তখন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এ রকম : ‘বালতিতে কী’? পানি। দেখাও। পানিও দেখালাম। তোমার ব্যাগে কী? একটা বই স্যার। কী বই?
জঙ্গি বই স্যার। বিরাট বড় এক জঙ্গির জীবন কথা। জঙ্গির নাম চেঙ্গিস খান। নাম শুনেছেন কি-না জানি না। দেখি বইটা। র্যাবের এই লোক (কথাবার্তায় মনে হচ্ছে অফিসার) বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বইটা কার? আমার মামাতো বোনের মেয়ের। মেয়ের নাম মিতু। ভিকারুননিসা স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ছাত্রী খারাপ না। স্যার, আমি এখন যেতে পারি? না। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে। আমি আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার ক্রসফায়ার হবে’? অফিসার জবাব দিলেন না। এর পরপরই এলো সেই মোক্ষম লাইন, যা হুমায়ূনের একান্ত নিজস্ব আবিষ্কার: ‘পুলিশের সঙ্গে র্যাবের এইটাই মনে হয় তফাত। পুলিশ কথা বেশি বলে। র্যাব চুপচাপ। তারা কর্মবীর। কর্মে বিশ্বাসী। ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠার জন্য, এই সাহসিকতা দেখানোর জন্যে হিমুকে সাধারণ মানুষ চিরকাল মনে রাখবে’।
মিসির আলীর সাইক এনালাইসিস ও দারুণ। এছাড়া তার গান ও নাটক সিনেমা তো রয়েছেই। ফলে টিকে থাকবেন অনেক বছর। (অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেনের একটি লেখার অংশবিশেষ) এরপর আমি হুমায়ূন মারা যাওয়ার পর সুনীল ও দেবেশ রায়ের দুই ইনটারভিউ পড়ি। সুনীল বলেন, হুমায়ূন শরতচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। অন্তত শত বছর মনে রাখবে তার পাঠক। আর দেবেশ রায় বলেন, আলগা পাণ্ডিত্য নেই, নেই আবার সস্তা দিনলিপি, একটা ট্র্যাজিকের ভেতর যেতে যেতে কমেডি বা উল্টোটা করে ফেলা বিশাল ব্যাপার। সেন্স অব হিউমারের মধ্য দিয়ে সাবলীল। আমি ব্যাক্তিগতভাবে তার ৫ টি বই মাত্র পড়েছি। এই ৫ বইয়ের জন্য তিনি অনেকদিন টিকে থাকবেন মনে করি। লেখক: সাংবাদিক