সহযোগীদের খবর: ওয়ান ইলেভেনের নামে রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনের নেপথ্যে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের আইনের আওতায় আনতে বিশেষ নির্দেশনা পেয়েছে পুলিশ। ২০০৭ সালে দেশে সেনাসমর্থিত সরকার আনার পেছনে যেসব কারিগর বা কুশীলবের ইন্ধন ছিল তাদেরও শনাক্তের কাজ শুরু হয়েছে। পুলিশের প্রায় সবকটি ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দেশ-বিদেশ থেকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ইতিমধ্যে ১১৩ জনের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হয়েছে। সূত্র: দেশ রূপান্তর প্রতিবেদন
তাদের মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আমলা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, কতিপয় বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। যারা দেশের বাইরে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করে আত্মগোপনে আছেন তাদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হচ্ছে বলেও একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পুলিশের ওই সূত্রটি জানায়, সপ্তাহখানেক আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইন্টারপোল সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তির তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদসহ আরও কিছু ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশে অবস্থান করছেন। তারা বাংলাদেশে অবস্থানকালে নানা অপকর্ম করেছেন। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের বিষয়ে নানা তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। রিমান্ডে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দীর্ঘ নীরবতার পর এই ইস্যুটি নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনার পেছনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (কুশীলব) কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাদের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কুশীলবদের মধ্যে যারা বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন, তাদের চলাফেরা এবং যোগাযোগের ওপর দিনরাত নজরদারি চলছে। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ও সীমান্ত এলাকাগুলোয় ইতিমধ্যে নামের তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওইসব কুশীলব পর্দার আড়ালে থেকে ঘটনার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছিলেন এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দিতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়া প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদের বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত কার্যালয় এবং গোপন আস্তানায় পাওয়া ‘টর্চার সেল’ বা নির্যাতন কক্ষের ভয়াবহতার তথ্য পেয়ে শিউরে উঠছেন তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। ডিজিটাল ফরেনসিক এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বের হয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যেখানে ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের নির্যাতনের বিষয়টি স্পট হয়ে উঠেছে।
ওয়ান ইলেভেনের ঘটনার মোড় ভিন্ন দিকে : শুরুতে ঘটনাটিকে সাধারণ প্রশাসনিক রদবদল বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হলেও, বর্তমান তদন্তে এর মোড় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে ঘুরে গেছে। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত একটি ‘সিস্টেমিক ম্যানিপুলেশন’ ছিল। প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ বলছে, ওয়ান ইলেভেনের সময় যে অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছিল, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের নির্দিষ্ট কিছু খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন জড়িত রয়েছে। আগে যে বিষয়গুলোকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে প্রচার করা হয়েছিল, বর্তমান নথিপত্রে সেগুলোর পেছনে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রমাণ মিলছে।
এই বিষয়ে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল বলেন, গ্রেপ্তারের পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ ও মামুনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তারা। সেনাশাসিত সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিষয়েও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মাসখানেক ধরেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মামুন খালেদের সব কর্মকা- নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। পরে সরকারের হাই কমান্ড থেকে সিগন্যাল আসার পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, আমলা, কয়েকজন ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগ নেতাসহ একাধিক পেশার লোকজনকেও এখন নজরদারির মধ্যে আনা হয়েছে।
দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ!: পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ওয়ান ইলেভেনের আড়ালে যারা দেশকে অশান্ত করেছেন তাদের বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। পুলিশের সবকটি ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। ইতিমধ্যে একশর বেশি ব্যক্তির প্রোফাইল সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার দেড় মাসের মাথায় ওয়ান ইলেভেনের কুশীলব হিসেবে পরিচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে ধরা হয়েছে। এরপর থেকেই আতঙ্কে আছেন ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা। যারা এখনো দেশে অবস্থান করছেন তারা আছেন গ্রেপ্তার আতঙ্কে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছাড়ারও চেষ্টা করছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এই জন্য আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।
ইন্টারপোলের দ্বারস্থ পুলিশ : ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের মধ্যে যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের বিষয়ে ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে একটি চিঠি দিয়ে ইন্টারপোলকে অবহিত করা হয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের পর অনেক কুশীলব আইনি জটিলতা এড়াতে সুকৌশলে দেশত্যাগ করেছেন। এই পলাতক আসামিরা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে তারা আছেন বলে ধারণা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না। যারা বিদেশে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনতে আমরা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি।’ খুবই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিস’ জারিও করা হতে পারে।
কমিশন গঠন করার পরিকল্পনা : সেনাসমর্থিত সরকারের নেপথ্যে ও সামনে যারা ছিলেন তাদের আইনের আওতায় আনতে সরকার একটি কমিশন গঠন করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ক্রিমিনাল অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। কেউ যদি অভিযোগ করেন সেক্ষেত্রে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত এবং বিচার হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের সময় কি কি অন্যায় অবিচার হয়েছিল তা নিরূপণে সরকার একটি কমিশনও গঠন করবে বলে আমরা জেনেছি। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে গঠিত হয় ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার। ওই সময় গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। সব ঝামেলা এড়াতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমেরিকায় নির্বাসিত জীবন বেছে নেন ফখরুদ্দীন আহমদ ও মইন ইউ আহমেদ। তাদের মতো একাধিক ব্যক্তি আছেন দেশের বাইরে। একাধিক কুশীলব দেশে থাকলেও তারা আছেন আতঙ্কে।
বিচার হবে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে : ওয়ান ইলেভেন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছেন তাদের সবাইকে তদন্তসাপেক্ষে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদ এবং মাসুদ উদ্দিনের অতীতের কর্মকান্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে এবং তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এক এগারো থেকে শুরু করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের এই দুই দোসর, অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
যারা এই দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন বিনষ্ট করার জন্যে এবং আয়নাঘরসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অমানবিক কর্মকান্ড করেছেন। সেইফ হাউজের মতো জায়গা সৃষ্টি করে মানুষকে নির্যাতন করেছেন। তারা গুম, খুন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে সব অভিযোগ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে, তাদের আমরা এই ট্রাইব্যুনালের আওতাধীন আনার চেষ্টা করছি। দুষ্কৃতকারীদের এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে সরকারি দায়িত্বে থেকে কোনো কর্মকর্তা মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধ করার সাহস না পায়।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদেরই বিচারের সম্মুখীন করা হবে। সেই যেই হোক, যত বড় শক্তিশালী মানুষই হোক।’
কুশীলবদের দায়মুক্তি তবে ফৌজদারিতে বাধা নেই : আওয়ামী লীগ সরকার ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের দায়মুক্তি দিলেও তাদের ফৌজদারি অপরাদের বিচারে বাধা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন আইনজীবী ও পুলিশ কর্তারা। দুই আইনজীবী ও পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সরকার সেনাসমর্থিত। সংবিধানে সেনাসমর্থিত সরকার বলতে কিছু নেই। কিন্তু ওই সরকারের সব কর্মকাণ্ড পরে সংসদে বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব পালনে কেউ যদি প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে নির্যাতন করেন তাহলে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যেতে পারে। এতে ফৌজদারি আইনে কোনো ধরনের বাধা নেই।