মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যের পাসির গুদাং এলাকায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৮৫ জন বাংলাদেশি শ্রমিক চরম মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ছয় মাস ধরে তারা বেতন ও অতিরিক্ত সময়ের (ওভারটাইম) পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। ফলে খাদ্য সংকট, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
শ্রমিকদের দাবি, এসস্টার ভিশন এসডিএন বিএইচডি (ইভিএসবি) নামের প্রতিষ্ঠানটির অধীনে কাজ করলেও দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে না। এমনকি গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে কোম্পানির পক্ষ থেকে খাদ্য সরবরাহও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
সোমবার (১৬ মার্চ) ভুক্তভোগী শ্রমিকরা যুগান্তরকে জানান, ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (আরএল নং: ৯৩৩) মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় আসেন। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালেও বাস্তবে তাদের সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় আসার পর থেকেই তারা ওই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কিন্তু গত প্রায় ছয় মাস ধরে কোনো ধরনের বেতন দেওয়া হয়নি। এতে করে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই দেশে যাওয়ার আগে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে এসেছেন। এখন সেই ঋণ পরিশোধ করা তো দূরের কথা, নিজেরাই জীবিকা নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে কোম্পানি তাদের জন্য খাবার সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
তারা জানান, বর্তমানে স্থানীয় কিছু বাংলাদেশির দেওয়া জাকাত ও সহায়তার খাবারের ওপর নির্ভর করে কোনোভাবে দিন পার করছিলেন। তবে সেই খাবারও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অনেক সময় তারা শুধু পানি দিয়ে ইফতার করছেন। আবার কখনো আগের দিনের বেঁচে থাকা পান্তা বা বাসি ভাত খেয়ে সেহরি সেরে নিতে হচ্ছে।
একজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। কাজ করছি, কিন্তু বেতন পাচ্ছি না। খাবারের ব্যবস্থাও নেই। এমন অবস্থায় আমাদের পরিবারগুলোর কথা ভাবলে আরও কষ্ট হয়।
দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও কোনো সমাধান না পেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার শ্রম দপ্তর (জেটিকে)-এ অভিযোগ দায়ের করেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরও এখন পর্যন্ত সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিকদের দাবি, শ্রম দপ্তরে অভিযোগ করার পর কোম্পানি তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। বকেয়া বেতনের দাবি তুলতেই কয়েকজন শ্রমিকের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজনের ভিসা নবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
শ্রমিকদের তথ্যমতে, বকেয়া বেতন আদায়ের চেষ্টা করায় কোম্পানি ছয়জন শ্রমিকের ভিসা বাতিল করেছে এবং একজনের ভিসা আট মাস ধরে নবায়ন করছে না। এছাড়া ১৮ মার্চ আটজন শ্রমিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, কোম্পানি তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের আশঙ্কা, এসব কাগজ ব্যবহার করে তাদের পাওনা বেতন আত্মসাৎ করা হতে পারে।
একই সঙ্গে কোম্পানি আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। ফলে মামলার শুনানিও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে।
শ্রমিকরা জানান, প্রায় চার মাস অপেক্ষা করার পর তারা শ্রম দপ্তরে অভিযোগ করেন। এখন শ্রম বিভাগ আগামী ১৭ এপ্রিল নিয়োগকর্তার সঙ্গে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছে। তবে ততদিন পর্যন্ত কীভাবে তারা জীবনযাপন করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সবাই।
ভুক্তভোগী শ্রমিকদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, তারা কয়েকবার কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়েছেন সহায়তার আশায়। কিন্তু সেখানে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক বলেন, আমরা আশা করেছিলাম হাইকমিশন আমাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু অনেক সময় মনে হয়েছে তারা কোম্পানির পক্ষেই কথা বলছেন।
তাদের দাবি, হাইকমিশনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি দেখলেও পাওনা বেতন আদায়ের জন্য কার্যকর কোনো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন না। এতে করে তারা নিজেদের আরও অসহায় মনে করছেন।
তবে শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকমিশনের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে অন্তত দুই মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইভিএসবির মুখপাত্র ল ইয়িক হুই বলেন, কোম্পানি বিদেশি শ্রমিকদের উত্থাপিত উদ্বেগ সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে শ্রম বিভাগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
তিনি দাবি করেন, কোম্পানি বেতন দিতে অস্বীকার করেনি এবং আইন অনুযায়ী সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের জন্য খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিজেদের খাবার কেনার জন্য কিছু আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
তবে শ্রমিকরা এ দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা খাবার দেওয়া হয়নি।
কোম্পানির মুখপাত্র আরও জানান, বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে এবং একটি সমঝোতা কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় কয়েকজন শ্রমিক ইতোমধ্যে সমঝোতায় পৌঁছেছেন এবং তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে এবং কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি, দ্রুত তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে এবং ‘রিলিজ লেটার’ দিতে হবে, যাতে তারা অন্যত্র কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন।
তাদের অনেকের পরিবার বাংলাদেশে তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বিদেশে আসার জন্য নেওয়া ঋণের চাপও তাদের ওপর রয়েছে।
শ্রমিকদের একজন বলেন, আমাদের দেশে পরিবার আছে। তাদের খরচ চালাতে হয়। আমরা যদি বেতন না পাই, তাহলে পরিবারগুলোও সংকটে পড়বে।
বর্তমানে তারা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটতে পারে এবং তারা ন্যায্য পাওনা ফিরে পাবেন।
সূত্র: যুগান্তর