জনশ্রুতি আছে, কথায় মানুষ হাতি পায়; কথায় মানুষ হাতির পায়। অর্থাৎ, কখনো কোনো একটি শব্দ বা বাক্য কিংবা একটি কথাই হতে পারে, হাতির মতো দামি মূল্যবান সম্পদ। কেননা প্রবাদে বলা হয়, হাতি মরলেও লাখ টাকা। বাঁচলেও লাখ টাকা। এজন্য হাতি পাওয়া যেমন ভাগ্যের। তেমনি হাতির পায়ে পিষ্ট হওয়া দুর্ভাগ্যের। কারণ এতে মৃত্যু নিশ্চিত! তাই যেকোনো কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। হুটহাট শব্দ একটি বলে দিলাম। কিন্তু তার অর্থ মর্ম নিয়ে ভাবার সময় হলো না। তবে এটি নিশ্চিত কাউকে অপমান-অপদস্থ করার নামান্তর। নিজের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব নষ্টেরও কারণ। এজন্যই আমাদের প্রত্যেকেরই কথা বলার ভাষা হওয়া দরকার সুন্দর ও শালীন। অশালীন ও অমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলা কাম্য নয় কখনোই!
আজকাল রাগ করে, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কিংবা বিপরীত মতাদর্শের অনুসারীদের আমরা যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করি। বিভিন্ন অশালীন কথা বলি। অশালীন অঙ্গভঙ্গিও করে থাকি। এমনকি যাকে তাকে কাফের বলতেও দ্বিধা করি না। আবার কোনো বিষয়বস্তুর মতভেদ। কিংবা ঐতিহাসিক তথ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কোরআন সুন্নাহ অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হন না অনেকে। ব্যবহার করেন অশালীন ভাষাও। এজন্য আমাদের কথা বলার ভাষা, বক্তব্য এবং উপস্থাপনাও হওয়া দরকার সুন্দর শালীন ও মার্জিত।
শুধু গালি ছুড়ে বা অশালীন কটূক্তি করেই সন্তুষ্ট হতে পারেন না অনেকে। অযথা কাউকে আবার কাফেরও বলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কোনো নফল বা মুস্তাহাব বিষয়কে ফরজের মর্যাদা দিয়ে কোনো মুসলমানকে পর্যন্ত কাফের বলা হচ্ছে। গালি ছোড়া হচ্ছে। সমালোচনা করা হচ্ছে। অথচ, যার সমালোচনা করা হচ্ছে; যাকে নিন্দা তিরস্কার প্রভৃতি কটুবাণে জর্জরিত করা হচ্ছে — বহুক্ষেত্রে সমালোচক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দল তার ছাত্র-শিষ্য হওয়ারও যোগ্য নন। এভাবে কথা বলায়, সমালোচনা করায় আমরা দিন দিন কেন এত বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছি? আর অমার্জিত অশালীন ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে! অথচ কোনো মানুষকে গালাগালি করা সামাজিকভাবেও বড় অন্যায় এবং ইসলামেও ফাসেকি তথা পাপকাজ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ উল্লেখ করেছেন। আর এটিও বলা হচ্ছে, এমন লোকদের সম্পর্কে যারা বিধর্মী। হ্যাঁ, যারা আল্লাহর দাসত্ব করে না। আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো ইবাদতও করে না। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, আর তোমরা তাদের গালমন্দ করো না, আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা ডাকে। ফলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, (নিজেদের জেদ বা ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য) শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত। এভাবেই আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য তাদের কর্মগুলো শোভিত করে দিয়েছি। তারপর তাদের রবের কাছেই হবে তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি জানিয়ে দেবেন তাদের, যা তারা করত। (সুরা আনআম, ১০৮)।এই আয়াতে যেখানে অমুসলিমকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। সেখানে মুসলমানদের গালি দেওয়া, অশালীন ভাষা প্রয়োগ করে কাউকে হেয় তুচ্ছ করা, মানহানি বা অপমান করা কীভাবে সিদ্ধ হতে পারে?
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি-পাপকাজ এবং হত্যা করা কুফরি। (বুখারি)। একইভাবে হাদিসে কোনো মানুষকে পাপী বা কাফের বলতেও নিষেধ করা হয়েছে। সাহাবি হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণনা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে পাপী বলে অপবাদ দেবে না। এমনকি কাফের বলেও দুর্নাম করবে না। যদি সে ব্যক্তি এমন না হয়, (অর্থাৎ যাকে গালি বা অপবাদ দেওয়া হয়েছে) তবে এ বাক্যটি তার (তথা গালিদাতার) দিকেই ফিরে যাবে। (বুখারি)
উপর্যুক্ত এ বর্ণনাটি প্রমাণ করে, কাউকে অন্যায়ভাবে কাফের বলা কত বড় মারাত্মক অন্যায়। যা প্রকারান্তরে নিজের ওপর কুফরির হুকুম আরোপ করার নামান্তর। অর্থাৎ, কাউকে অন্যায়ভাবে বিনা কারণে অহেতুক কাফের বলা, নিজেকেই কাফের হিসেবে গণ্য করা। কাজেই সুস্পষ্ট শরয়ি বর্ণনা এবং প্রকাশ্য কুফরি কাজ করা ব্যতীত কাউকে কাফের বলা হতেও বিরত থাকা জরুরি। মনে রাখা উচিত, যাকে তাকে অহেতুক কাফের ফাসেক বলাও এক ধরনের অশালীন ভাষা প্রয়োগ। যা পরিহার করা জরুরি। এজন্য আমাদের ভাষা হওয়া দরকার সুন্দর, শালীন ও মার্জিত।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর