এনডিটিভি: সম্প্রতি আমেরিকার বড় বড় টেক কোম্পানিতে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন এইচ-১বি ভিসাধারী ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মীরা। অনেক বছর ধরে ভারতীয় প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার ডেভেলপারেরা আমেরিকার বড় বড় টেক কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। তারা কোড লিখেছেন, টিম পরিচালনা করেছেন, বাড়ি কিনেছেন, পরিবার গড়েছেন এবং ভেবেছিলেন তাদের জীবন এখন স্থায়ী ও নিরাপদ।
কিন্তু এখন, একটি ই-মেইলই তাদের অনেকের পুরো জীবন বদলে দিচ্ছে। খবর এনডিটিভির।
আমেরিকার টেক ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন করে চাকরিচ্যুতির ফলে মানুষ যে শুধু চাকরিই হারাচ্ছে তা নয়, বরং ভারতীয় কর্মীদের মধ্যে পুরোনো এক ভয় নতুন করে দেখা দিয়েছে। আর তা হলো— চাকরি হারালে হয়তো আমেরিকায় থাকার অধিকারও হারাতে হবে।
সিলিকন ভ্যালির অনেক কোম্পানি এখন খরচ কমানোর পথে হাঁটছে। মেটা এআই-তে বেশি বিনিয়োগ করতে গিয়ে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। অ্যামাজনও একের পর এক টিম কমাচ্ছে। লিংকডইনও এআই ও অটোমেশনের কারণে কর্মী কমিয়েছে।
ভারতীয় কর্মীদের জন্য এই ছাঁটাই শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। তাদের জন্য এটি খুব ব্যক্তিগত ও ভয়ঙ্কর একটি বিষয়। কারণ, আমেরিকায় চাকরি হারানো মানেই অনেক সময় দেশে ফিরে যাওয়ার ক্ষণগণনা শুরু হওয়া।
ভারতীয় কর্মীদের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে
আমেরিকায় থাকা বেশিরভাগ ভারতীয় টেক কর্মী এইচ-১বি ভিসায় কাজ করেন। এই ভিসা সরাসরি চাকরিদাতার সঙ্গে যুক্ত। তাই চাকরি চলে গেলে সাধারণত মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে নতুন কোম্পানি খুঁজে নিতে হয়। না হলে দেশ ছাড়তে হতে পারে।
এই চাপ পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়। একটি ছাঁটাই তখন হয়ে যায় সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়, যেখানে ভিসার কাগজপত্র, বাড়ির ঋণ, সন্তানের স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ সবকিছু জড়িয়ে যায়।
অনেক ভারতীয় বহু বছর ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় আছেন। কারও সন্তান আমেরিকায় জন্মেছে, কেউ বাড়িও কিনেছেন। তারা ভেবেছিলেন দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকবেন। কিন্তু চাকরি হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই সব পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
খবরে বলা হচ্ছে, ছাঁটাই হওয়া বহু ভারতীয় কর্মী এখন আমেরিকায় কিছুদিন বেশি থাকার জন্য অন্য উপায় খুঁজছেন। অনেকে বি-২ ভিজিটর ভিসায় পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন, যাতে কয়েক মাস বেশি থেকে নতুন চাকরি খোঁজার সুযোগ পাওয়া যায়।
এইচ-১বি এর ৬০ দিনের নিয়ম আসলে কী?
আমেরিকার ইউএসসিআইএস নিয়ম অনুযায়ী, এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীরা চাকরি হারানোর পর সাধারণত ৬০ দিনের 'গ্রেস পিরিয়ড' পান। অথবা তাদের আইন-৯৪ স্ট্যাটাস শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় পান। এই সময়ের মধ্যে নতুন চাকরি, নতুন ভিসা বা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ৬০ দিন শুরু হয় চাকরির শেষ দিন থেকে, শেষ বেতন পাওয়ার দিন থেকে নয়।
এই নিয়ম করা হয়েছিল বিদেশি দক্ষ কর্মীদের কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাস্তবে দুই মাস খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়, বিশেষ করে সেই সময়টাতে যখন পুরো টেক ইন্ডাস্ট্রিতেই নিয়োগ কম হয়।
নতুন স্পন্সর কোম্পানি পাওয়া সহজ নয়। ইন্টারভিউ, ভিসা ট্রান্সফার, কাগজপত্র — সবকিছুতেই সময় লাগে। তাছাড়া কোম্পানিগুলো এখন নতুন লোক নিতে আরও সতর্ক হচ্ছে।
এ কারণে অনেক ইমিগ্রেশন আইনজীবী আগে পরামর্শ দিতেন, সাময়িকভাবে বি-১ বা বি-২ ভিসায় পরিবর্তন করতে। এতে চাকরি খোঁজার জন্য কিছু অতিরিক্ত সময় পাওয়া যেত।
এই সুযোগ এখনও আইনিভাবে আছে। তবে সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, এখন আমেরিকান কর্তৃপক্ষ এসব আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করছে। অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে এবং বেশি প্রশ্ন করা হচ্ছে। ফলে কর্মীদের মধ্যে ভয় বাড়ছে যে, বিকল্প পরিকল্পনাগুলোও হয়তো আর যথেষ্ট নিরাপদ নয়। আর এই ভয় আরও বাড়ছে টেক ইন্ডাস্ট্রির বড় আকারের ছাঁটাইয়ের কারণে।
সিলিকন ভ্যালিতে ব্যাপক ছাঁটাই
লেঅফ.এফওয়াইআই অনুযায়ী, শুধু এই বছরেই এক লাখ ১০ হাজারের বেশি টেক কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এর বড় অংশই বিদেশি কর্মী, বিশেষ করে ভারতীয়। কারণ এইচ-১বি ভিসার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী তারাই।
আমেরিকার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার বেশিরভাগই ছিলেন ভারতীয়। এখন এই অনিশ্চয়তা বহু ভারতীয়কে তাদের 'আমেরিকান ড্রিম' নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অনুবাদ: টিবিএস