২০১৯ সাল, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পার হতে চলছে। 'বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ কিনবেন ট্রাম্প'— তখন এমন শিরোনামে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার ইচ্ছার খবর প্রকাশিত হয়।
এতে বলা হয়, ২০১৮ সালে এক নৈশভোজে ট্রাম্প এ বিষয়ে তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত জানতে চাইলে কেউ কেউ রসিকতা করেন। তখন কেউ বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি, বরং অনেকে মজাও করেন।
গ্রিনল্যান্ডের জনগণের ভাষ্য ছিল, 'ট্রাম্প নাকি ডেনমার্ক সফরে যাচ্ছেন তাদের দ্বীপ কিনতেই।'
কেউ কেউ মনে করেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার যেভাবে আলাস্কাকে মার্কিন অঙ্গরাজ্য ঘোষণা করেন, ট্রাম্পেরও হয়তো ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার এমন কোনো বাসনা রয়েছে।
২০২৬ সালে এসে এটা স্পষ্ট হলো যে গ্রিনল্যান্ড কেনার ধারণা ট্রাম্পের কোনো খামখেয়ালি ছিল না, বরং এটি দীর্ঘদিনের এক পরিকল্পনা।
আর এই পরিকল্পনার নেপথ্যে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধু, রিপাবলিকান মেগা-ডোনার ও বিশ্বখ্যাত প্রসাধনী ব্র্যান্ড 'এস্তে লাউডার'— এর উত্তরাধিকারী রোনাল্ড লাউডার।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে, কখন গ্রিনল্যান্ড দখলের বুদ্ধি ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন তার এই বিলিয়নেয়ার বন্ধু।
তৎকালীন ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গার্ডিয়ানকে বলেন, '২০১৮ সালে নতুন একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য হঠাৎ একদিন আমাকে ওভাল অফিসে আসতে বলেন ট্রাম্প।'
'ওভাল অফিসে আসার পর ট্রাম্প বলেন, একজন প্রভাবশালী ধনী ব্যবসায়ী তাকে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন,' বলেন বোল্টন।
প্রস্তাবটি তখন বিস্ময়কর মনে হয়েছিল বোল্টনের কাছে। তিনি খুঁজতে থাকেন, এমন বুদ্ধি কে ট্রাম্পকে দিতে পারে। বোল্টনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ব্যবসায়ী ছিলেন রোনাল্ড লাউডার। তার সঙ্গেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন ট্রাম্প।
বোল্টন জানান, এই বিলিয়নিয়ারের পরামর্শেই সেসময় ডেনমার্ক-নিয়ন্ত্রিত গ্রিনল্যান্ডসহ আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খতিয়ে দেখতে হোয়াইট হাউস থেকে একটি দল সেখানে পাঠানো হয়।
বোল্টন বলেন, 'বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে শোনা অনেক তথ্যকে সত্য ধরে নিতেন ট্রাম্প। আর একবার যেটা ঠিক করতেন, সেটা সহজে বদলাতেন না ট্রাম্প।'
রোনাল্ড লাউডার কে
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রসাধনী ব্র্যান্ড 'এস্তে লাউডার'–এর উত্তরাধিকারী তিনি। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত লাউডারের মোট সম্পদের পরিমাণ চার হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
পারিবারিক প্রসাধনী ব্যবসার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইউরোপীয় ও ন্যাটো নীতির জন্য উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পরে অস্ট্রিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে নিউইয়র্কের মেয়র পদে নির্বাচন করে ব্যর্থ হন।
বর্তমানে ওয়ার্ল্ড জিউইশ কংগ্রেসের সভাপতি লাউডার। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে ইসরায়েল-বান্ধব করতে কয়েক দশক ধরে কাজ করছেন।
রিপাবলিকান পার্টির দীর্ঘদিনের দাতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু ও সমর্থক লাউডার নিজেই নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ষাটের দশকে পেনসিলভানিয়ায় বিজনেস স্কুলে পড়ার সময় ট্রাম্পের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
অর্থাৎ, ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে ট্রাম্পকে চেনেন তিনি।
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্পের ভিক্টরি ফান্ডে এক লাখ ডলার ও ২০২৫ সালে ৫০ লাখ ডলার অনুদান দেন লাউডার।
লাউডার কেবল পরামর্শই দেন না, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থও বিনিয়োগ করেন।
বিশ্লেষকরা জানান, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক যোগাযোগ—এই তিনের সমন্বয় রয়েছে ৮১ বছর বয়সী লাউডারের মধ্যে।
গ্রিনল্যান্ড: ভূ-রাজনীতি বনাম ব্যবসায়িক কৌশল
আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আর্কটিক অঞ্চলের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। আজও নর্থ গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে শুরু করেছে, উন্মুক্ত হচ্ছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ ও নতুন নৌপথ। ফলে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২০২৩ সালের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে 'গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টি গ্রিনল্যান্ডে আছে।
মার্কিন সাংবাদিক পিটার বেকার এবং সুসান গ্লাসারের লেখা 'দ্য ডিভাইডার' বইয়ে প্রথম গ্রিনল্যান্ডের দিকে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণের পেছনে রোলান্ড লাউডারের ভূমিকা উঠে আসে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্পকে সবচেয়ে জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করা শুরু করেন লাউডার।
এর মধ্যে আর্কটিক অঞ্চল দখলে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ বরফে আচ্ছাদিত। ছবি: সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও একই এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর লাউডার। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্প ও লাউডার—দুজনেরই আগ্রহের কমতি নেই।
গার্ডিয়ানে বলা হয়, লাউডারের প্রস্তাবই ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিয়েছে। আট বছর পর এসে তিনি এখন গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা ভাবছেন না, বরং শক্তি প্রয়োগ করে দখলে নিতে চাচ্ছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে গ্রিনল্যান্ড দখলের আগ্রহ সরাসরি প্রকাশ করলে ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই দেন লাউডার।
নিউইয়র্ক পোস্টে তিনি লেখেন, 'ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ধারণা কখনোই হাস্যকর ছিল না—এটি ছিল কৌশলগত।'
তিনি আরও লেখেন, 'বরফ ও পাথরের নিচে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত অস্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য দুর্লভ খনিজের বিশাল ভান্ডার। বরফ গলতে থাকায় নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।'
গ্রিনল্যান্ডের ব্যবসায়ী ও সরকারি নেতাদের সঙ্গে বহু বছর ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা নিজেই স্বীকার করে লাউডার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
লাউডার ২০১৮ সাল থেকেই ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত ওই অঞ্চলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন এবং নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ বিস্তৃত করেন।
ডেনমার্কের করপোরেট নথি ও ড্যানিশ পত্রিকার তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্রিনল্যান্ডে বিনিয়োগ করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক একটি কোম্পানি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লাউডারও আছেন।
বিনিয়োগকারীরা এরই মধ্যে বাফিন বে দ্বীপ থেকে 'লাক্সারি স্প্রিংওয়াটার' রপ্তানি শুরু করেছে। তারা গ্রিনল্যান্ডের বৃহত্তম হ্রদ থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় সরবরাহের পরিকল্পনাও করছে।
ন্যাটোভুক্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জোটের অন্য সদস্য রাষ্ট্রে দখলদারত্ব চালালে জোট ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে এরইমধ্যে সতর্ক করেছে ডেনমার্ক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাও ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেনা মোতায়েনও শুরু করেছে গ্রিনল্যান্ডে।
তবে ট্রাম্প এখনো তার অবস্থানে অটল। ভালোভাবে হোক বা কঠিনভাবে—গ্রিনল্যান্ড চান তিনি।
কেন ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড কেনার বুদ্ধি দিয়েছিলেন লাউডার?
পিটার বেকার ও সুসান গ্লাসারের লেখা 'দ্য ডিভাইডার' বইসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্প-লাউডার দুই পুরোনো বন্ধুর গ্রিনল্যান্ড দখলের ভাবনার পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে।
প্রথমত— আর্কটিক অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। রাশিয়া ও চীনের আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে গ্রিনল্যান্ডকে একটি 'কৌশলগত পুরস্কার' হিসেবে দেখেন লাউডার।
দ্বিতীয়ত— খনিজ সম্পদ আহরণ। বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল খনিজ সম্পদ এবং বিরল মৃত্তিকা দখলের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও রয়েছে এই ভাবনার পেছনে।
তৃতীয়ত— প্যাক্স জুডাইকা। বিশ্লেষকদের মতে, লাউডারের মতো ব্যক্তিরা মনে করেন, ভূ-রাজনীতিসহ পুরো বিশ্বব্যবস্থা চলবে প্রভাবশালী ও ধনী জায়নবাদীদের আদর্শে। এক্ষেত্রে কূটনীতির চেয়ে অধিগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ।
লাউডারের মতো লবিস্টরা মনে করেন, কোনো দেশ বা ভূখণ্ড যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে তা সরাসরি কিনে নেওয়াই শ্রেয়।
এটি ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করলেও, লাউডারের কাছে এটি 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিরই একটি অংশ।
ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের দিকেও নজর
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি সমর্থন করার পাশাপাশি ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ চুক্তিতেও জড়িত ছিলেন লাউডার। বলা হয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউক্রেনের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করতে লাউডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে লাউডারের কোম্পানির টেন্ডার পাওয়া সেই ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।
২০২৩ সালে টেকমেট কোম্পানির প্রধানের একটি চিঠি অনুযায়ী, লাউডার একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের লিথিয়াম খনিজ উত্তোলনের প্রাথমিক দরপত্রে জেতেন।
লাউডার সেসময় ব্যাখ্যা করেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা করেননি।
নিউইয়র্ক পোস্টে তিনি লেখেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বহু বছর ধরেই আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে আসছি।'
তবে, এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মার্কিন নীতিনির্ধারণে লাউডারের মতো ধনী ব্যবসায়ীর স্পষ্ট সম্পৃক্ততা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত ও তার ঘনিষ্ঠজনদের সম্পদ বৃদ্ধির প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
সমালোচকদের মতে, ক্ষমতা ও পুঁজি কীভাবে একত্রিত হয় এবং পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্য একটি সুযোগ হয়ে ওঠে—তারই দৃষ্টান্ত ট্রাম্প-লাউডার। উৎস: ডেইলি স্টার।