২০২৫ সাল ছিল বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রযুক্তির ঝোড়ো পরিবর্তনের বছর। একদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আঞ্চলিক সংঘাত বিশ্বকে আরো বিভক্ত করেছে, অন্যদিকে এআই ও সবুজ শক্তিতে অগ্রগতি কিছু আশার ইঙ্গিত দিয়েছে। ঘটনাবহুল এ বছর শেষে ফিরে দেখা যাক কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
নতুন প্রেসিডেন্ট, পুরনো বিতর্ক
২০২৫ সালের শুরুতেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় পুনরায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেরা।
জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শপথ নিয়ে প্রথম দিনেই ২৬টি এক্সিকিউটিভ অর্ডার জারি করেন তিনি। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, ডিইআই প্রোগ্রাম বাতিল এবং ইমিগ্রেশন নীতি আরো কঠোর করার সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে চীনসহ একাধিক দেশের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপে বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন ট্রেড ওয়ারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে
নতুন বছর শুরু হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের গতি কমেনি। রাশিয়া কুরস্ক পুনরুদ্ধারের দাবি করে, তবে উভয় পক্ষেই বিপুল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। মানবিক সংকট আরো গভীর হয়।
ইসরায়েল-হামাস দ্বিতীয় যুদ্ধবিরতি
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলা যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল-হামাসের মধ্যে জিম্মি ও বন্দি বিনিময় হয়, তবে স্থায়ী শান্তির সুযোগ তৈরি হয়নি।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও লড়াই
মার্চে যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে ইসরায়েল-হামাস সংঘাত পুনরায় শুরু হয়। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাও বেড়ে যায়।
ক্ষমতার পালাবদল
ভ্যাটিকানে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে। ২১ এপ্রিল পোপ ফ্রান্সিস মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পরবর্তীতে নতুন পোপ হিসেবে ইতিহাসে প্রথম আমেরিকান পোপ নির্বাচিত হন ‘পোপ লিও চতুর্দশ’।
পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলা থেকে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত
২২ এপ্রিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু পর্যটক। দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) প্রথমে দায় স্বীকার করে, পরে অস্বীকার করে। ভারত এটিকে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জৈশ-ই-মোহাম্মদের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করে। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাব দেয়।
৭ মে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে সীমান্তে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ভারত অপারেশন সিন্দুর শুরু করে। পাকিস্তান পালটা প্রতিক্রিয়া জানায়। কয়েকদিনের তীব্র লড়াইয়ের পর ১০ মে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও উভয় দেশের মধ্যে বৈরিতা আরো গভীর হয়।
এয়ার ইন্ডিয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনা
যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত কারণে ১২ জুন ভারতের আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের পরপরই এয়ার ইন্ডিয়ার একটি লন্ডনগামী ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়। ফ্লাইটে থাকা ২৪২ জন যাত্রীর মধ্যে ২৪১ জনেরই মৃত্যুতে ভারতসহ বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং বিমান নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
‘নো কিংস’ আন্দোলন
১৪ জুন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিনে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে কানাডা, ইউরোপ, জাপান ও মেক্সিকোতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত এটি ট্রাম্পের নীতি (ইমিগ্রেশন, ট্যারিফ) এর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়।
টুয়েলভ-ডে ওয়ার
জুনের মাঝামাঝি ইসরায়েল ইরানের নিউক্লিয়ার সাইটে হামলা শুরু করে। ইরান প্রতিক্রিয়া জানায় মিসাইল দিয়ে। ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ‘বাঙ্কার ব্লাস্টার’ বোমা দিয়ে ইরানের নিউক্লিয়ার সাইট আক্রমণ করে। ২৪ জুন যুদ্ধবিরতি হয়। যুদ্ধে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ বিজ্ঞানি নিহত হন।
থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক সংকট
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘাতের মধ্যে কম্বোডিয়ান নেতা হুন সেনের থাই প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রার একটি কল রেকর্ড প্রকাশ হয়। এটিকে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলশ্রুতিতে ১ জুলাই সাংবিধানিক আদালত শিনাওয়াত্রাকে সাময়িক বহিস্কার করে।
ইউক্রেনে বিক্ষোভ
২২ জুলাই ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো হাজার হাজার মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কিয়েভে রাস্তায় নামে। মূলত দুর্নীতি দমন সংস্থা নিয়ন্ত্রণের নতুন আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ হয়।
ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ বৈঠক
১৫ আগস্ট আলাস্কার অ্যাংকোরেজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ সময় কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হয়নি। কোনো রূপ ফল ছাড়াই বৈঠক তাড়াতাড়ি শেষ হয়।
থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী পদচ্যুতি
২৯ আগস্ট সাংবিধানিক আদালত পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রাকে স্থায়ীভাবে পদ থেকে অপসারণ করে। এর ফলে ব্যাংককে বড় বিক্ষোভ হয় এবং অনুতিন চার্নভিরাকুল নতুন প্রধানমন্ত্রী হন।
চার্লি কির্ক হত্যা
১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রক্ষণশীল অ্যাক্টিভিস্ট এবং টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর প্রতিষ্ঠাতা চার্লি কির্ক ইউটা ভ্যালি ইউনিভার্সিটিতে একটি ডিবেটের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এটি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতার বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।
তরুণদের বিক্ষোভে কাঁপল রাষ্ট্র
নেপালে ৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ ক্রমেই দুর্নীতি ও অপশাসনবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার পতন হয়।
এ ছাড়া আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলেও তরুণদের আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এতে কাতারি নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ কয়েকজন নিহত হন, যা আন্তর্জাতিক নিন্দার ঝড় তোলে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা
জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারকর্মীরা ৪২টি জাহাজ নিয়ে গাজা অভিমুখে যাত্রা করে। সেপ্টেম্বর জুড়ে বিভিন্ন সময় ইসরায়েল এতে বাধা দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সব কটি জাহাজ থামিয়ে দেয় ইসরায়েল এবং কর্মীদের আটক করে।
গাজা শান্তিচুক্তি
অক্টোবর মাসে ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০-দফা পরিকল্পনার প্রথম ধাপ অনুযায়ী এটি হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েল-হামাসের মধ্যে বন্দি বিনিময় হয়।
সুদান গৃহযুদ্ধ
অক্টোবরের শেষ দিকে আরএসএফ এল ফাশের দখল করে, দারফুরে এসএএফের শেষ ঘাঁটি হারায়। হাজার হাজার বেসামরিক নিহত এবং দুর্ভিক্ষ তীব্র হয়। যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগ ওঠে আরএসএফের বিরুদ্ধে।দ
ল্যুভর মিউজিয়াম ডাকাতি
১৯ অক্টোবর প্যারিসের ল্যুভরে দিনের বেলায় বড় ডাকাতি হয়। এতে মূল্যবান গয়না চুরি হয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিতর্ক
শুরু থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার দাবি করে আসলেও নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ১০ অক্টোবর অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নাম ঘোষণা করে। তবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন চলা সত্ত্বেও মাচাদো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করায় পুরস্কারটি বিতর্কিত হয়। এ ছাড়া নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সখ্যতাও বিতর্ক উসকে দেয়।
থাইল্যান্ডে নির্বাচন ঘোষণা
১৫ ডিসেম্বর থাই পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হয়। নতুন প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল ২০২৬-এর মে মাসে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
পুতিনের ‘বাসভবনে’ হামলা
বড়দিনেও রাশিয়া কিয়েভসহ বড় শহরে বড় ড্রোন হামলা চালায়। তবে ২৯ ডিসেম্বর রাশিয়া পুতিনের বাসভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে, যদিও ইউক্রেন তা অস্বীকার করে।
মায়ানমার নির্বাচন
বৈশ্বিক সমালোচনা সত্ত্বেও ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করে মায়ানমারের জান্তা সরকার। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দাবি করে সেনা-সমর্থিত রাজনৈতিক দল।
ইয়েমেন ঘিরে আবুধাবি-রিয়াদ উত্তেজনা
২৬ ডিসেম্বরে ইয়েমেনে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গভীর উত্তেজনা দেখা দেয়। এটি দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় ফাটল সৃষ্টি করে এবং ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নতুন মোড় আনে। দক্ষিণ ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত এসটিসির আক্রমণাত্মক অগ্রগতির ফলেই মূলত এ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে সৌদি জাতীয় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে ও বিমান হামলা চালায়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর নাগাদ জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৫৭টি দেশ (প্রায় ৮১%) ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে জি-৭ দেশের মধ্যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাও অন্তর্ভুক্ত।
২০২৫ সাল স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—বিশ্ব যতই সংযুক্ত হোক, ভঙ্গুরতাও বাড়তে পারে ততই। বছরজুড়ে যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয়, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবে একই বছরে প্রযুক্তির অগ্রগতি, সবুজ শক্তিতে বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নতুন দিগন্তও দেখা গেছে। ২০২৫ সাল সামনে এনে দিয়ে বিশ্বের ভবিষ্যৎ ঘিরে নানা প্রশ্ন। এ প্রশ্নগুলোর জবাবই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের বিশ্ব শান্তি ও স্থিতির পথে এগোবে, নাকি বিভক্তির বোঝা আরো ভারী হবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ