মৃত্যুর পর আখেরাতের প্রথম মনজিল হলো কবর; যা আখিরাতের যাত্রার সূচনা। ইসলামের আলোকে কবরকে বলা হয়েছে পরকালের প্রথম পরীক্ষা ক্ষেত্র। যারা কবরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে তাদের জন্য পরকালের পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হয়ে যাবে। আর যারা কবরের প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে যাবে, তাদের আখেরাতের জীবন কঠিন হয়ে যাবে। হাদিসে পাকে এসেছে—
كَانَ عُثْمَانُ إِذَا وَقَفَ عَلَى قَبْرٍ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ فَقِيلَ لَهُ تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلاَ تَبْكِي وَتَبْكِي مِنْ هَذَا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنَازِلِ الآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ " . قَالَ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " مَا رَأَيْتُ مَنْظَرًا قَطُّ إِلاَّ وَالْقَبْرُ أَفْظَعُ مِنْهُ
‘ওসমান (রা.) কোনো কবরের পাশে দাড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তার দাঁড়ি ভিজে যেত। তাকে প্রশ্ন করা হলো— জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ এই কবর দর্শনে এত বেশি কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আখিরাতের মানজিলসমূহের (প্রাসাদ) মধ্যে কবর হলো প্রথম মানজিল। এখান থেকে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানজিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর সে এখান থেকে মুক্তি না পেলে তবে তার জন্য পরবর্তী মানজিলগুলো আরও বেশি কঠিন হবে। তিনি (ওসমান) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, আমি কবরের দৃশ্যের চেয়ে অধিক ভয়ংকর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি।’ (তিরমিজি ২৩০৮)
কবরে যে তিনটি প্রশ্ন করা হবে
কবরের ভেতরে প্রতিটি মানুষকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হবে—
১. তোমার রব কে?
এই প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারবে কেবল সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াতে আল্লাহকে একমাত্র প্রতিপালক হিসেবে মেনে চলেছে। যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা উত্তর দিতে পারবে না। কুরআনুল কারিমে এসেছে—
اِتَّخَذُوۡۤا اَحۡبَارَهُمۡ وَ رُهۡبَانَهُمۡ اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ ۚ وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡۤا اِلٰـهًا وَّاحِدًا ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ سُبۡحٰنَهٗ عَمَّا یُشۡرِكُوۡنَ
‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরিক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।’ (সুরা তাওবা: আয়াত ৩১)
২. তোমার দ্বীন কী?
যারা দুনিয়াতে ইসলামকে পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারাই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। আর যারা অন্য বিধানকে জীবনব্যবস্থা বানিয়েছে, তারা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡهُ ۚ وَ هُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ
‘আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৮৫)
৩. তোমাদের মধ্যে প্রেরিত ব্যক্তি কে?
এখানে প্রশ্ন করা হবে—তোমার নবী কে ছিল? তুমি কার অনুসরণ করেছ?
যারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ অনুসরণ করেছে, তারাই সঠিক উত্তর দিতে পারবে। হাদিসে পাকে এসেছে, যারা এই তিন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবে, আকাশ থেকে ঘোষণা আসবে— ‘আমার বান্দা সত্য বলেছে। তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, জান্নাতের পোশাক পরিয়ে দাও এবং জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও।’ এরপর তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের শান্তি তার কাছে আসতে থাকবে। (মুসনাদ আহমদ, মিশকাত: ১৫৪২)
কবরের এই তিনটি প্রশ্নই মানুষের ইমান, আমল ও জীবনের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করবে। তাই দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ, ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা মেনে চলাই হবে পরকালের সফলতার আসল প্রস্তুতি।