পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার প্রচার টান টান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। আর এই প্রচার পর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ দুই ডজনেরও বেশি তারকা প্রচারক এনে বিজেপি পরিবর্তনের ঢেউ তুলতে চেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের গড় বলে পরিচিত প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে। পাল্টা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি’র সেই সম্ভাবনাকে খারিজ করে দিয়েছেন।
গড় রক্ষায় তিনি বেশ প্রত্যয়ী। প্রথম দফার ভোটে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে মমতা সরকার গঠনে নিশ্চিত। তিনি ভবানিপুর কেন্দ্রে এক প্রচার সভায় বলেছেন, প্রথম দফায় সেঞ্চুরি হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ডাবল সেঞ্চুরি করতে হবে। সেই মতো ভোট দিন। অন্যদিকে মোদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে গিয়েছেন, বিজেপি’র শপথ গ্রহণে তিনি ফিরে আসবেন।
শেষ দফায় বুধবার (২৯শে এপ্রিল) পশ্চিমবঙ্গের সাতটি জেলার ১৪২টি আসনে ভোট নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১১১টি আসন রয়েছে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের ৫টি জেলায়। এই আসনগুলো হলো- উত্তর ২৪ পরগনা (৩৩), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৩১), নদিয়া (১৭), হাওড়া (১৬) এবং কলকাতা (১১), ২০ ও ২১ বাকি দু’টি জেলা হলো পূর্ব বর্ধমান (১৬টি আসন) এবং হুগলি (১৮টি আসন)। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের ১১১টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ৯৬টি, বিজেপি ১৪টি এবং বাকিরা একটি আসনে জয়লাভ করেছিল। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই জেলাগুলোতে তাদের ভোটের শতাংশ বাড়িয়েছিল এবং ২১টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল, যেখানে তৃণমূল ৯০টি আসনে এগিয়ে ছিল। আর শহুরে ও গ্রামীণ উভয় বসতির দু’টি জেলায়ও মানুষ ২০২১ সালে বিপুলভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছিল।
এই দফায় প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ ভোটার ভোট দিয়ে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। শেষ দফায় মোট ৪১৪৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় ২১৮ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একই সঙ্গে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ জন।
শেষ দফার নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আধ ডজনেরও বেশি মন্ত্রীর নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে। এ ছাড়া এই পর্বে বেশ কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক প্রার্থীরও ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- তৃণমূল কংগ্রেসের অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী, অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক ব্রাত্য বসু, অভিনেত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজ চক্রবর্তী। এবার তৃণমূল কংগ্রেস দুজন সাংবাদিককেও প্রার্থী করেছেন। এরা হলেন- দেবদীপ পুরোহিত ও কুণাল ঘোষ।
তৃণমূলের তুলনায় সংখ্যায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও বিজেপি’র সেলিব্রিটি প্রার্থীর তালিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিজেপি’র হয়ে সোনারপুর দক্ষিণ থেকে লড়ছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, টালিগঞ্জে অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী, অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ আর শ্যামপুর আসনে অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়। বিজেপি প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্তও এই দফায় ভাগ্য নির্ধারণে শামিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দফায় নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বেশ কয়েক হাজার ভোটারের নাম বাদ দেয়া, নারীদের সুরক্ষা, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্প, মতুয়া নাগরিকত্ব, কৃষি সংকট এবং শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের সরকারবিরোধী মনোভাব মানুষের পছন্দ নির্ধারণ করবে।
অতীতে দক্ষিণবঙ্গে এবং কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মানুষ বিভিন্ন নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিলেও, এবার শাসক দলের প্রার্থীরা বিজেপি এবং বামফ্রন্টের প্রার্থীদের কাছ থেকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হচ্ছেন। কোথাও কোথাও রয়েছে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের প্রার্থীরা।
কলকাতার ১১টি আসনের মধ্যে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র রয়েছে। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন বিরোধী দলনেতা বিজেপি’র শুভেন্দু অধিকারী। এই কেন্দ্রের জয়- পরাজয় দুজনের কাছেই চ্যালেঞ্জ। এই কেন্দ্রে শুভেন্দুকে জয়ী করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সর্বাত্মক প্রচারে শামিল হয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবারের নির্বাচনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই সব আসনগুলোতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) সর্বাধিক সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
এদিকে পূর্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে নির্বাচন কমিশন শেষ দফায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আঁটসাঁট করেছে। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য রাজ্য জুড়ে রেকর্ড সংখ্যক ২,৪৫০টি কেন্দ্রীয় আধাসামরিক কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে। যেগুলোতে প্রায় ২.৫ লাখ জওয়ান রয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের জন্য ২,৩২১ কোম্পানি সিএপিএফ মোতায়েন করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা সূত্রে একথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বাহিনী থাকছে কলকাতায়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কলকাতার পরই সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে পূর্ব বর্ধমানে। সেখানে ২৬০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকছে। অন্যদিকে হুগলি গ্রামীণে ২৩৪ কোম্পানি, বারুইপুর পুলিশ জেলায় ১৬১ কোম্পানি, বারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটে ১৬০ কোম্পানি, কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলায় ১৫৮ কোম্পানি, হাওড়া গ্রামীণে ১৪৭ কোম্পানি, ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলায় ১৩৫ কোম্পানি, রানাঘাট পুলিশ জেলায় ১২৭ কোম্পানি, বসিরহাট পুলিশ জেলায় ১২৩ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন থাকছে।
পাশাপাশি সুন্দরবন পুলিশ জেলায় ১১৩ কোম্পানি, বারাসত পুলিশ জেলায় ১১২ কোম্পানি, হাওড়া পুলিশ কমিশনারেটে ১১০, চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটে ৮৩, বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে ৫০ এবং আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটে ১৩ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন করেছে নির্বাচন কমিশন। জানা গেছে, এই দফায় নজরদারির জন্য অকিরিক্ত সংখ্যায় ড্রোন কাজে লাগানো হবে। ইতিমধ্যেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রায় দেড় হাজার সম্ভাব্য হাঙ্গামাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বুধবার গোটা কলকাতা শহর জুড়েই টহল দেবে পুলিশ ও আধাসেনার বাইক। কলকাতার পরিস্থিতি নিয়ে সমস্ত সিভিল সেক্টর অফিসার, পুলিশ সেক্টর অফিসার, জেনারেল অবজার্ভার, পুলিশ অবজার্ভার, স্পেশ্যাল অবজার্ভার, পুলিশের সিনিয়র আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠকে বসেছিল কমিশন। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দও। বৈঠকের পর পুলিশ কমিশনার জানান, বুথ ধরে ধরে যে সব পরিকল্পনা রয়েছে, কোথায় কতো কুইক রেসপন্স টিম, কন্ট্রোল রয়েছে, অভিযোগ জানানোর কী ব্যবস্থা আছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব কী কী, কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে কী করা হবে, এই সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।