মনজুর এ আজিজ: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানির ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রথমবারের মতো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি স্থবির হয়ে পড়ার প্রভাবেই এই পরিবর্তন ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস।
কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি নির্ভরতা বাড়ায় জ্বালানির ভারসাম্য বদলে গেছে। একই সঙ্গে আমদানি করা কয়লার ব্যবহারও দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুরের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ৩টার দিকে ৫ হাজার ১৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শীর্ষে অবস্থান নেয়। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন করে ৪ হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট।
ওই সময় দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৯ মেগাওয়াট, যা পরে সন্ধ্যার দিকে চাহিদা কমে যাওয়ায় হ্রাস পায়। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ অর্থাৎ ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক এবং ২৭ শতাংশ বা ৭ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক। তবে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ঘাটতির কারণে অনেক কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গ্যাস থেকে ৫ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট এবং কয়লা থেকে ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সংকটে থাকা তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র আগামী মে মাসের শুরুতে আবার উৎপাদনে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে করে কয়লার ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, বছরের পর বছর দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নিজস্ব গ্যাসের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু বিনিয়োগ ও নীতিগত মনোযোগের অভাবে ধীরে ধীরে দেশ আমদানি জ্বালানির দিকে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, আমদানি করা এলএনজি ব্যয়বহুল হলেও কয়লা তুলনামূলক সস্তা। তবে পরিবেশগত দিক থেকে এর ক্ষতি বেশি। তাঁর মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না নেওয়াই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের এখনও উল্লেখযোগ্য হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তা কাজে লাগাতে হলে ধারাবাহিক নীতি, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রয়োজন।
বিদ্যুতের খরচের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৭ টাকা ৯ পয়সা, কয়লার ক্ষেত্রে ১৩ টাকা ২০ পয়সা এবং তরল জ্বালানির ক্ষেত্রে ২৭ টাকা ৩৯ পয়সা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হিসাবের মধ্যে দেশীয় গ্যাসের দাম ধরা হলেও এলএনজি আমদানি খরচ যোগ করলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি দাঁড়ায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশে মোট ২ হাজার ৬১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল আমদানি করা এলএনজি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ঘনফুট।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম বলেন, স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো একটি কৌশলগত প্রয়োজন। তাঁর মতে, কয়লা এখনো এলএনজি ও তরল জ্বালানির তুলনায় সাশ্রয়ী। তিনি বলেন, ‘যদিও কয়লাকে দূষণকারী জ্বালানি হিসেবে সমালোচনা করা হয়, তবুও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিকল্প উৎস বড় পরিসরে চালু না হওয়া পর্যন্ত এটিই বেসলোড বিদ্যুতের প্রধান ভিত্তি হিসেবে থাকবে।’ বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশ ও এশিয়ার কিছু দেশ এখনো কয়লার ওপর নির্ভরশীল।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা এমবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে বিদ্যুতের প্রায় ৩৪ শতাংশ এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, যা প্রথমবারের মতো কয়লার অংশকে ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া গত বছরে বিশ্বব্যাপী কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬৩ টেরাওয়াট-ঘণ্টা কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২০ সালের পর প্রথম বড় পতন। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের এই পরিবর্তন তাই একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতির চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট করছে।