শিরোনাম

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল, ২০২২, ০১:১৬ দুপুর
আপডেট : ০৯ মে, ২০২২, ০৫:২১ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কৃষিতে বিনা উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্ভাবনা, বিস্তৃত হচ্ছে হাওরের রূপ

আল আমীন, ময়মনসিংহ: [২] বর্ষায় কূলহীন সমুদ্র আর শীতে শুকিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত শ্যামল প্রান্তর হচ্ছে দেশের হাওরের রূপ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৭টি জেলার প্রায় সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমি নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে রয়েছে এই হাওর অঞ্চল। 

[৩] অভিধান ও শব্দের ইতিহাস বলে সাগর শব্দের অপভ্রংশ শব্দ হচ্ছে হাওর। প্রকৃত অর্থে নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি ও অর্থনীতিতে হাওরের গুরুত্ব সাগরের মত সীমাহীন। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) হাওরের অবদান ৬-৮ শতাংশ। এদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬-১৮ শতাংশ এবং উন্মুক্ত উৎসের মাছের ২৮ শতাংশ আসে হাওর থেকে। হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি কৃষিজীবি (৫৩.৬৭%),অকৃষি শ্রমিক (৬.১৩%) এবং মৎস্যজীবি (২.৫৯%) ।

[৪] বোরো ধান হাওর অঞ্চলের প্রধান ফসল। ধান ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষ আকষ্মিক বন্যা বা পাহাড়ী ঢলের আতঙ্কে থাকে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ (চৈত্র ও বৈশাখ) পর্যন্ত সময়টা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আকষ্মিক বন্যার মূল কারণ উজানের অংশ ভারতের প্রবল বর্ষনের পানি, যা দ্রুত বেগে বাংলাদেশে সমতল ভূমিতে চলে আসে যাতে করে হাওর এলাকার ফসলী জমি তলিয়ে যায়। বন্যার এ আকষ্মিক ভয়াবহতা নিয়েই এ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা চলে আসছে। বর্তমানে হাওর অববাহিকায় উজান থেকে নেমে আসা পানির গতি প্রকৃতিতে লক্ষনীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। 

[৫] গত ৩০-৩৫ বছর আগের অবস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে স্বাভাবিক অবস্থায় এখন ১০-১৫ দিন আগেই উজান থেকে ঢলের পানি নেমে আসছে। হাওরের এই প্রতিকূল পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে এনে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহের মধ্যে অন্যতম। হাওর অঞ্চলের কৃষি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বল্প জীবনকাল (১৩০-১৩৫দিন), উচ্চ ফলনশীল এবং ঘাত সহিষ্ণু ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবন করা। হাওর এলাকার মানুষের জীবন জীবিকা রক্ষা তথা ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রাথমিক অবস্থায় ঠান্ডা সাহিঞ্চু এবং বন্যা আসার আগেই ঘরে তোলা যায় এমন আগাম ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এর মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা।

[৬] ধানের ক্ষেত্রে স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন আলোক অসংবেদনশীল জাতসমূহ হাওরে চাষের জন্য উপযোগী। বিনা উদ্ভাবিত বিনাধান-১৭ আমন মৌসুমের জন্য অনুমোদিত হলেও জাতটি আলোক অসংবেদনশীল হওয়ায় প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায় অর্থাৎ আউশ ও বোরো মৌসুমেও চাষ করা যায়। গত আমন মৌসুমে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ৮০ ভাগ আবাদী জমিতে বিনাধান-১৭ চাষ করে সাফল্য পায় এলাকার কৃষক। বর্তমান বোরো মৌসুমে বিনার সুনামগঞ্জ উপকেন্দ্রের সহায়তায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নেই প্রায় ৩০০ একর জমি বিনাধান-১৭ চাষের আওতায় এসেছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডাকুয়ার হাওরের প্রায় ৫০ ভাগ জমিতে এবছর বিনাধান-১৭ চাষাবাদ হচ্ছে। তাছাড়া সুরমা ইউনিয়নের প্রায় ৬০ ভাগ জমি বিনাধান-১৭ চাষের আওতাধীন। এছাড়া বিনা’র সুনামগঞ্জ, নালিতাবাড়ি এবং কুমিল্লা উপকেন্দ্র থেকে চলতি বোরো মৌসুমে চাষের জন্য বিনাধান-১৭ এর প্রায় তিন টন বীজ বিতরণ করা হয়েছে যা হাওর
এলাকার প্রায় ৩০০ একর জমিতে চাষ করা হয়েছে। জাতটি আলোক অসংবেদনশীল হওয়ার কারণে বোরো মৌসুমেও কৃষক এ জাতটি চাষাবাদ করে সফলতা পাচ্ছেন।

[৭] এবছর হাওরের বেশ কিছু এলাকাতে ধানের শীষ বের হওয়ার সময়ে পানির স্বল্পতা থাকায় অধিকাংশ ধানের জাতে প্রচুর পরিমাণে চিটা হয়েছে। কিন্তু বিনাধান-১৭ এর ব্যতিক্রম। এটি উচ্চ ফলনশীল, স্বল্প মেয়াদী, খরা সহিষ্ণু (৩০% পানি কম প্রয়োজন), এবং এ জাত চাষেসার কম লাগে (প্রচলিত জাতের তুলনায় ইউরিয়া সার ৩০% কম লাগে)। জাতটি খরা সহিষ্ণুবলে এ জাতে চিটা হয়নি। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী ধানের জমিতে ব্লাস্ট রোগের উপদ্রব থাকলেও এবছর বিনাধান-১৭ জাতে ব্লাস্টের আক্রমণ হয় নি বলেই দেখা যায়। জাতটি পরিপক্ক্ব হতে ১৪০-১৪৫ দিন সময় নেয় যা বোরো মৌসুমের অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলনায় ১০-১৫ দিন আগাম। এ সকল কারণে বোরো মৌসুমে সঠিক ব্যবস্থাপনায় জাতটি গড়ে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৮.৫-৯.০ টন ফলন দিতে সক্ষম যা অন্য যে কোনো জাতের তুলনায় বেশি। বোরো মৌসুমেও জাতটির সাফল্য সুনামগঞ্জের কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যার ফলে আগামি বোরো মৌসুমে দেশের অন্যান্য হাওর এলাকায় জাতটির সম্প্রসারণের হলে জাতটি চাষাবাদে কৃষক উপকৃত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। 

[৮] আমান মৌসুমে সাময়ীক জলামগ্নতা সহিষ্ণু আমান ধানের জাত বিনাধান-১১ ও বিনাধান-১২ হাওরের কৃষিকে আরো বেগবান করতে সক্ষম হবে। ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বিনাধান-১১ হতে হেক্টর প্রতি ৪.০-৪.৫ টন এবং বন্যামুক্ত জমি হতে ৫.০-৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়, যার জীবনকাল মাত্র ১১৫-১২০দিন। বিনাধান-১২ এর চাল মিনিকেট চালের মত, এর জীবনকাল মৌসুমে ১২৫-১৩০ দিন। ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বিনাধান-১২ (জীবনকাল ১২৫-১৩০ দিন) হতে বন্যা আক্রান্ত জমিতে হেক্টর প্রতি ৪.০-৪.৫ টন এবং বন্যামুক্ত জমিতে ৩.৫-৪.০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। জাত দু’টি আলোক অসংবেদনশীল হওয়ায় আমন মৌসুমের মত বোরো মৌসুমে ও চাষ করা সম্ভপর হবে।

[৯] হাওর এলাকার প্রায় ২০% জমি তুলনামূলক ভাবে উঁচু (কান্দা, চালা, টেক, টান)। এ জমি ধান চাষের উপযোগী নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব জমি পতিত থাকে। তবে এ জমি রবি ফসলের উপযোগী। পানি সেচ ছাড়া রবি মৌসুমে যে সব ফসল আবাদ করা যায় যেমন সরিষা, চিনাবাদাম, গম ইত্যাদির আবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে হাওরে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব। গভীর হাওরের কিছু জমি আছে যা সাধারণত বন্যার পানিতে অপেক্ষাকৃত দেরিতে ডুবে আবার আগে জাগে। এমন জমিতে বিনা চাষে সরিষা আবাদ করা যায়। বিনা উদ্ভাবিত বিনাসরিষা-৯ বিনা চাষে আবাদ উপযোগী সরিষার জাত। এর জীবনকাল ৮২-৮৫ দিন, ফলন ১৫-২০ মণ/একর।

[১০] চিনাবাদামের উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে রয়েছে বিনাচিনাবাদাম-৪, যার জীবনকাল ১৪০-১৫০ এবং গড় ফলন ২.৬-২.৮ টন/হে.। তাছাড়া যে সব এলাকায় সেচের সুবিধা কম সেখানে খরা সহনশীল তিলের জাত বিনাতিল-২ ও বিনাতিল-৪ চাষের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের ঘাটতি কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। তাছাড়া মুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত বিনামুগ-৫, বিনামুগ-৭ ও বিনামুগ-৮, মসুর (বিনামসুর-৫, বিনামসুর-৬, বিনামসুর-৯), বিনাখেসারী-১, বিনামাস-১ ও বিনামাস-২ এবং ছোলার (বিনাছোলা- ৪, বিনাছোলা-১০ ও বিনাছোলা-১১) জাতগুলো হাওর এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ করে কৃষকগণ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

[১১] যুগযুগ ধরে হাওর অঞ্চলের মানুষ পাহাড়ী ঢলের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন যাপন করে আসছে। সময় এসেছে এখন প্রকৃতির সাথে তালমিলিয়ে আমাদের জীবন ব্যবস্থা সাজানোর। 

[১২] ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম জানান, কৃষি ব্যবস্থা ফসলের জাত নির্বাচন, চাষাবাদ এবং অন্যান্য জীবন আচার প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে সাজাতে হবে। হাওর এলাকায় বিনা উদ্ভাবিত ঘাত সহিষ্ণু ধান, গম, ডাল ও তেল জাতীয় ফসলের আবাদ বৃদ্ধির জন্য গৃহীত বিনা’র চলমান গবেষণা কার্যক্রমসমূহ রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান সুদূঢ় করতে সক্ষম হবে। উপযুক্ত জাত উদ্ভাবন ও যথাযথ সম্প্রসারণ এর উপর আগামী দিনের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভরশীল। এমন অবস্থায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)।

  • সর্বশেষ