মনজুর এ আজিজ : নিয়মিত সিডিউলের এলএনজি কার্গোগুলো ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ফলে এলএনজি নিয়ে আসা কার্গোগুলো আগামী ৩, ৫, ৯ এবং ১১ মার্চ দেশে পৌঁছাবে বলে আশার কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এ ৪ কার্গো এলএনজি দিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিনের সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব বলে জানা গেছে। মার্চে মোট ৯ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে কাতার থেকে ৬টি, অস্ট্রেলিয়া থেকে দু’টি কার্গো আসার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট ডেস্কের একজন কর্মকর্তা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি যতদূর খবর জেনেছি তাতে ৪টি কার্গো ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। মার্চে ৯টি, এপ্রিল ১১টি এবং মে মাসে ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে ১৯ কার্গো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার কথা। এক কার্গোতে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। যা বাংলাদেশের একদিনের চাহিদা থেকেও কম। দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া কমবেশি ১৭১৪ মিলিয়নের সঙ্গে ৮০০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে মহেশখালীতে অবস্থিত ২টি ভাসমান টার্মিনালের।
কাতার এবং ওমান থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে জাহাজ আসতে ৯ থেকে ১৩ দিন সময় প্রয়োজন হয়। এমনকি আমেরিকা ও অ্যাঙ্গোলা থেকে আমদানিকৃত এলএনজিও পানামা চ্যানেল দিয়ে হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে। এতে সময় প্রয়োজন হয় ২৫ দিনের মতো। বিকল্প রুট ভারতের মুম্বাই হয়ে আনা অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
কাতার এবং ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকেও দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হয়। কাতার এবং ওমানে পাশাপাশি আমেরিকা, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি সরবরাহ পাওয়া যায়। তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য।
এখনই গ্যাস সংকটে নাকাল অবস্থা, আমদানি করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না ঘাটতি। এই সময়ে আমদানি ব্যহত হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে সেচ এবং গীষ্ম মৌসুমের বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা নিয়ে পেট্রোবাংলা কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলে। একেক সময় একেক রকম তথ্য দেখা যায়। ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে পাইপলাইনে সংযুক্ত গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা ৫৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ৬ মাস পর (আগস্টে) সার উৎপাদনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের সময় চাহিদা বলা হয় ৫১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে বড় অংকের প্রতিশ্রুত ও অপেক্ষমান গ্রাহক।
নব নির্বাচিত বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সামনে যেদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) চাহিদা ৩৮০০ তুলে ধরা হয়, ওই দিনও পেট্রোবাংলার উৎপাদন বিবরণীতে চাহিদা বলা হয়েছে ৪৪০২ মিলিয়ন ঘনফুট। ওই দিনের বিবরণীতে বলা হয়েছে বিদ্যুতে ২৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৭৭৯.৯ মিলিয়ন ঘনফুট, সার উৎপাদনে ৩২৯ মিলিয়নের বিপরীতে ১৭৯ মিলিয়ন, অন্যান্য (শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিক, সিএনজি ও চা উৎপাদন) খাতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১৫৪৯ মিলিয়ন। যদিও অন্যান্য খাতের চাহিদা কখনই আলাদা করে উল্লেখ করা হয় না। ওই দিনও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং অনেক এলাকায় সংকটের খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অন্যান্য খাতে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা আরও অনেক বেশি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়। ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্জ দ্বীপ থেকেও এ পথ দিয়ে তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই ইরান সংকট বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তিগুলো হয় ৬ মাস মেয়াদী। আগামী জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে- এগুলো আসবে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। এই রুটে ইরান সংকটের প্রভাব পড়বে না।
পরিশোধিত জ্বালানি তেলে সমস্যা না হলেও সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল আমদানিতে প্রভাব পড়তে পারে। ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত জানান, এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্রুড অয়েল আমদানিতে প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র মতে, এক সময় দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেতো। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর মজুদ কমে যাওয়ায়, প্রতিদিনেই কমছে উৎপাদন। প্রয়োজন ছিল তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া, সেদিকে না গিয়ে আমদানির পথে পা বাড়িয়েছে বিগত সরকার। গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১৮ সাল থেকে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এরপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে খোলাবাজারের পাশাপাশি ওমান থেকেও এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। যার প্রায় পুরোটাই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে।