শিরোনাম
◈ ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ শেষের পথে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় আউটার রিং রোড, খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার ◈ ১০ টাকার নোটের দাম ২০ হাজার, সুন্দরবনে দস্যুদের অভিনব চাঁদাবাজি ◈ সঙ্গীসহ বিনামূল্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, আবেদন করবেন যেভাবে ◈ আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি, পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ; কাঁচা কদু-ডাল খাইয়ে হাতে-পায়ে শিকল, যেভাবে পাহাড়ে চলত মানবপাচার ◈ এবার হবিগঞ্জে জাতীয় গ্রিডের পাইপলাইন ছিদ্র করে ৪ হাজার ২৯২ লিটার তেল চুরি ◈ পুলিশি হামলার বিচার চেয়ে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, অধ্যক্ষকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা শিক্ষার্থীদের ◈ কারাগারের নিরাপত্তা জোরদারে ৭ দফা নির্দেশনা, সিসিটিভি নজরদারি ও আকস্মিক পরিদর্শন বাধ্যতামূলক ◈ সরকারি দপ্তরে ঘুষ-খরচ কমলে শ্রমিকদের ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া সম্ভব: মাসুদুজ্জামান ◈ দুই দশকের বেশি সময়েও থামেনি রাজনৈতিক সহিংসতা, সরকার বদলালেও বদলায়নি সংঘাতের চিত্র

প্রকাশিত : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৫ রাত
আপডেট : ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টেকনাফের পাহাড়ে ৩ মরদেহ, উদ্ধারের চেষ্টায় যৌথবাহিনী

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : কক্সবাজারের টেকনাফের গহীন পাহাড়ে মানবপাচারকারি চক্রের সাথে গোলাগুলির পর নিহত সেনা সদস্য মো. তিতাস শেখের মরদেহ হেলিকপ্টর যোগে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া পাঠানো হচ্ছে।

রামু সেনা নিবাসে আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে হেলিকপ্টরটি যাত্রা দেয়। সন্ধ্যার আগেই তিতাসের গ্রামের বাড়ি লস্করদিয়ায় পৌঁছে মরদে। এর আগে শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। এর পরই মরদেহ নেয়া হয় রামু সেনা নিবাসে।

বৃহস্পতিবার টেকনাফের গহীন পাহাড়ে মানবপাচারকারিদের সাথে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনায় মো. তিতাস শেখ নামে এই সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত সেনাসদস্য মোঃ তিতাস শেখ ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের পুত্র।

এর মধ্যে শুক্রবার দুপুরে টেকনাফের পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর সাথে গোলাগুলির পর জিন্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে টেকনাফ থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনায় অস্ত্র সহ আটক ৬ মানবপাচারকারিকেও দেয়া হয়েছে পুলিশের কাছে। 

Advertisement

টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এদের আদালতের মাধ্যমে স্বজনদের হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া পাহাড়ে অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।’

তিনি বলেন, গতকাল ৫৭ জিম্মিকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে জানা যায় একজন দালাল জিন্মিদের মধ্যে ছিলেন।  

আট দিন ঝুপড়িতে বন্দি, পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আট দিন ধরে মানব পাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আমাকে বন্দি করে রেখেছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও পারিনি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।

আসাদুজ্জামান তিনি জানান, কক্সবাজারের একটি ব্রিজে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাঁকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ গতকাল আমাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। ভাগ্যিস, সেনাবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করেছে।’

পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, ‘কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল আমাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারি, তারা আমাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনেছে। পাঁচ দিন ধরে দেখেছি, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছে। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হতো। আমরাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।’

তাঁরা আরও বলেন, ‘দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু আর ডাল। ক্ষুধায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিল। গতকাল আমাদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের কথা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী আমাদের উদ্ধার করে।’

হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, ‘পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে মানব পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই।’

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে। এখানে সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারো পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও আমরা খোঁজখবর রাখছি।

তিনি বলেন, সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন

এদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফের পাহাড়ের অপরাধিদের আস্তানা ঘিরে যৌথবাহিনী বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, জানান, অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’

স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই অভিযানে বিজিবি, পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়। এক সঙ্গে না হলে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, অভিযান চলাকালিন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে দুর্গম পাহাড়ে তিন জনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়েছে যৌথ বাহিনী। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মরদেহ উদ্ধারে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওই পাহাড়ে তিন জনের মরদেহ থাকার খবর পেয়েছেন তারা। লাশ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া পাহাড়ে সেনা সদস্যকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ ও অপরাধিদের দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির দাবিতে টেকনাফ ও উখিয়া মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে মানববন্ধনও করেছে টেকনাফের সাধারণ ছাত্র-জনতা।

যেখানে টেকনাফের পাহাড় ঘিরে যৌথ অভিযান অব্যাà