শিরোনাম
◈ শুল্কের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি, আয় বেড়েছে ১১.৫১ শতাংশ ◈ ‘আসামে এলে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেব’, রাহুলকে হিমন্ত ◈ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ব্যবসায় নামতে চায় টিসিবি ◈ অল্প সময়ে বেশি ফলন, কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে মুড়িকাটা পেঁয়াজে ◈ শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি গড়তে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ জাতীয় সংসদ ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একাধিক সুপারিশ কমিটির ◈ মাইকিং করে বাণিজ্যমেলার মাঠে ভাঙচুর, ভেকু দিয়ে গেট ভাঙছেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা: মাঠ বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ◈ মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বরপ্লেট নিয়ে যে নতুন সিদ্ধান্ত ◈ এবার বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড আড়াই ঘণ্টা পোশাক শ্রমিকদের অবরোধ ◈ জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান: রাষ্ট্রপতি

প্রকাশিত : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৫ বিকাল
আপডেট : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৮ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফিরতে পারে ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ

এম. এমরান পাটোয়ারী : একসময় ট্রেনের হুইসেলে মুখর থাকত ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী অঞ্চলের রেলস্টেশনগুলো। যাত্রীদের পদচারণা, পণ্য পরিবহন আর রেলগাড়ির শব্দে প্রাণচঞ্চল ছিল পুরো এলাকা। সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্য এখন অতীত। দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ। রেললাইন, স্টেশন ও রেলওয়ের মূল্যবান সম্পত্তির অনেকটাই এখন দখল, অযত্ন ও অবহেলার শিকার। তবে নতুন করে এ রেলপথে ট্রেন চালুর প্রস্তাব ওঠায় পরশুরাম-ফুলগাজীর মানুষের মধ্যে আবারও আশার সঞ্চার হয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর ফেনী জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় বন্ধ থাকা ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথে দুটি ছোট বগি দিয়েও ট্রেন চালুর প্রস্তাব দেন ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাউছার হামিদ। তিনি রেলওয়ের সম্পত্তি দখলমুক্ত ও সংরক্ষণের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ট্রেন চালুর বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব করেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম। প্রস্তাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। তবে এখন পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ, রেলওয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন কিংবা পুননির্মাণ শুরুর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে দুই বগির ট্রেন চালুর প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রধান প্রশ্ন।

প্রায় ২৯ বছর ধরে বন্ধ রেল যোগাযোগ :

Advertisement

রেলওয়ে ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৯ সালে ফেনী থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলের মানুষের জেলা সদরে যাতায়াত, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত রেলপথটি।

ফেনী থেকে শুরু হয়ে বন্ধুয়া, দৌলতপুর, আনন্দপুর, পীরবক্স মুন্সিরহাট, নতুন মুন্সিরহাট, ফুলগাজী, চিথলিয়া, পরশুরাম হয়ে বিলোনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এ রেলপথ। সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে রেলপথে যাত্রী ও আয় কমতে থাকে। একপর্যায়ে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়।

এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে রেলপথটি। অর্থাৎ প্রায় ২৯ বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ রেল যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত।

রেললাইন চালু করতে কত টাকা লাগতে পারে :

ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ পুনরায় চালু করতে সম্ভাব্য ব্যয় নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। রেললাইনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ থেকে ৩০ কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটারে নতুন রেলপথ নির্মাণে আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা ব্যয় ধরে হিসাব করলে পুরো রেলপথ নির্মাণে খরচ হতে পারে প্রায় ৮১০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা।

তবে এটি একটি ধারণাভিত্তিক হিসাব, কোনো সরকারি প্রকল্প ব্যয় বা অনুমোদিত বাজেট নয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রেলপথটির বর্তমান অবকাঠামো, রেললাইন ও স্লিপারের অবস্থা, সেতু-কালভার্ট সংস্কার, জমি উদ্ধার, স্টেশন পুনর্র্নিমাণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের ওপর প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরই পুনরায় চালুর প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুরো রেলপথ পুনর্র্নিমাণের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে ট্রেন চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করা হোক। এতে বিদ্যমান অবকাঠামোর কতটুকু ব্যবহার করা সম্ভব এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, তা জানা যাবে।

দখল-অযত্নে অস্তিত্ব সংকটে রেলপথ :

দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রেলপথের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ও স্লিপার হারিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রেললাইনের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা। পরশুরামসহ ফুলগাজীর কয়েকটি স্টেশন ভবনও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে স্টেশন এলাকা, কোথাও নষ্ট হয়েছে অবকাঠামো। রেলওয়ের সম্পত্তি যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করায় সরকারি সম্পদ বেহাত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০১৯ সালে রেলপথটি পুনঃস্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও জরিপের উদ্যোগের কথাও আগে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও দৃশ্যমান পুনর্র্নিমাণকাজ শুরু হয়নি।

শুধু যাত্রী নয়, বাণিজ্যেও খুলতে পারে সম্ভাবনার দুয়ার :

ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ চালু হলে শুধু পরশুরাম ও ফুলগাজীর মানুষের যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে না, সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে সীমান্তবাণিজ্যেও। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়া এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশের বিলোনিয়া স্থলবন্দরের যোগাযোগ রয়েছে। এ রেলপথ পুনরায় চালু ও প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ফেনীর উত্তরাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী বাণিজ্যিক এলাকার রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পণ্য পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দুই দেশের প্রয়োজনীয় সমন্বয়।

আগেও এসেছে আশ্বাস, এবার বাস্তবায়ন চান এলাকাবাসী :

ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ পুনরায় চালুর আলোচনা নতুন নয়। ২০১৮ সালে জরিপ, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ এবং রেলপথ পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৯ সালেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কথা সামনে আসে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়নি।
২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও রেলপথটি চালুর দাবি এবং রেলওয়ের জমি দখলের বিষয়টি উঠে আসে। একই বছরের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে রেলপথটির বেহাল অবস্থার পাশাপাশি পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সর্বশেষ ১৮ অক্টোবর জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় দুটি ছোট বগি দিয়ে ট্রেন চালুর প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন প্রস্তাব ও আশ্বাসের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রথম পর্যায়ে সীমিত পরিসরে হলেও ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হোক। পাশাপাশি রেলওয়ের জমি উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ, অবকাঠামো সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরো রেলপথ পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হোক।

পরশুরাম ও ফুলগাজীর মানুষের কাছে রেলপথটি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অংশ। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও পরশুরাম স্টেশনে ট্রেনের হুইসেল বাজবে—এমন স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রশাসন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষা।

ফেনী রেলওয়ে স্টেশন মাষ্টার মোঃ হারুন জানান”দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে বন্ধ থাকা ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথটি আমাদের অঞ্চলের জন্য এক ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। ১৯৯৭ সালের ১৭ আগস্ট এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে রেললাইন, স্টেশন ও এর মূল্যবান সম্পত্তির একটি বড় অংশ অযত্ন, অবহেলা ও জবরদখলের শিকার হয়েছে।

তবে সম্প্রতি এই রেলপথে পুনরায় ট্রেন চালুর যে প্রস্তাব এসেছে, তাতে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এই রেলপথটি পুনরায় চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতির সৃষ্টি হবে। কর্তৃপক্ষ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলে রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধার ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

ফেনী রেলওয়ে ভূমি অফিসের কানুনগো বিপ্লব দাস জানান, ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ ও রেলওয়ের বেদখল হয়ে যাওয়া সরকারি সম্পত্তি কোনোভাবেই এভাবে ফেলে রাখা যায় না। সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং তা পুনঃউদ্ধারে আমরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছি। ইতিমধ্যে ফেনী রেলওয়ে ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে দখলকৃত সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খুব দ্রুতই এই তালিকা চূড়ান্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রেলওয়ের প্রতিটি ইঞ্চি জমি ও সম্পত্তি উদ্ধার করা হবে।”

ফেনী ১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু জানান, ফেনীর মানুষ চাইলে এটি পূনরায় চালু হতে পারে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুহুরী কহুয়া প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে, যাতে মানুষ বন্যা থেকে রক্ষা পায়।

  • সর্বশেষ