সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। এবার পানির নিচে বিশেষভাবে তৈরি ডুবন্ত ক্যারিয়ারে ইয়াবা নিয়ে আসার কৌশল শনাক্ত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ইলেকট্রিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকলের সাহায্যে পানির নিচ দিয়ে ক্যারিয়ার টেনে আনা হতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এ কৌশলে ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ তিনজনকে আটক করেছে বিজিবি। এ সময় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলি ও ২ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর রাতে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ও বালুখালী সীমান্ত ফাঁড়ির (বিওপি) আওতাধীন এলাকায় পৃথক দুটি অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে উখিয়া ব্যাটালিয়ন ৬৪ বিজিবির মিডিয়া হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
আটক ব্যক্তিরা হলেন উখিয়ার বালুখালী রহমতের বিল এলাকার ফরিদের ছেলে রকি আহমেদ (২৬), নলবনিয়া এলাকার নুর আলমের ছেলে বেলাল উদ্দিন (৩৫) এবং মধ্যম ফারির বিল এলাকার খোরশেদ আলমের ছেলে খোরশেদ আলম (২৬)।
বিজিবি জানায়, ১২ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে পালংখালী বিওপির একটি টহল দল উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় মনিরের ঘেরের একটি মাচাংঘরের পাশে চার থেকে পাঁচজনকে সন্দেহজনকভাবে অবস্থান করতে দেখে টহল দল। বিজিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করলে কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া করে দুজনকে আটক করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা ও ঘেরের ঘরে তল্লাশি চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া একটি মোবাইল ফোন, নয়টি কপিকল, বিশেষ ধরনের একটি ডুবন্ত ক্যারিয়ার, নৌকা টানার জন্য প্রায় দুই কিলোমিটার স্টিলের তার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি ব্যাটারি ও একটি ইলেকট্রিক মোটরসহ ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পৃথক অভিযানে আরেকজনকে আটক করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি অধিনায়ক বলেন, উদ্ধার করা সরঞ্জাম পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের একটি ডুবন্ত ক্যারিয়ারে একসঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ পিস ইয়াবা পরিবহন করা সম্ভব। মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পেরিয়ে ক্যারিয়ারের মাধ্যমে ইয়াবা সীমান্তবর্তী এলাকায় আনা হতো। পরে ইলেকট্রিক মোটর, স্টিলের তার ও কপিকল ব্যবহার করে পালংখালীর ফাইস্যা খাল দিয়ে ক্যারিয়ারটি বাংলাদেশের প্রায় এক কিলোমিটার অভ্যন্তরে টেনে নেওয়া হতো।
তিনি জানান, খালটি আঁকাবাঁকা হওয়ায় পাচারকারীরা কপিকল ও স্টিলের তার ব্যবহার করে পানির নিচের পথকে কয়েকটি সরল অংশে ভাগ করেছিল। খালের বাঁক অতিক্রমের সময় ছোট কপিকলগুলো খুলে পরবর্তী অংশে স্থাপন করা হতো। এভাবে ধাপে ধাপে ক্যারিয়ারটি সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের এক থেকে দেড় কিলোমিটার অভ্যন্তরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ সময় চক্রের একজন পানিতে হাত দিয়ে মাছ ধরার অভিনয় করতেন বলে বিজিবির তথ্য।
বিজিবির দাবি, পানির ওপর থেকে সহজে শনাক্ত করা যায় না—এমন কৌশলে ইয়াবা পাচারের জন্য এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছিল। সীমান্তে নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ায় চোরাকারবারিরা প্রচলিত পদ্ধতি বাদ দিয়ে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। তবে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, বিজিবির আন্তরিকতা, দেশপ্রেম, পেশাদারত্ব, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সমন্বয়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষায় স্থানীয় জনগণ, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে উখিয়া থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় নৌকার মাধ্যমে রশি দিয়ে পানির নিচে ইয়াবার চালান টেনে নেওয়ার সময় ১৪ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, উখিয়ায় এবারও একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলের আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
উখিয়া ব্যাটালিয়ন ৬৪ বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাদকবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে আনুমানিক ১ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মাদক চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২৮ জনকে আটক করা হয়েছে।