প্রতিবছর শীতের সময় ঢাকায় বায়ুদূষণ বাড়লেও এবার শীত শুরুর বেশ আগে থেকেই রাজধানীর বাতাসে বেড়েছে দূষণের পরিমাণ। দূষিত শহরের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকছে ঢাকার অবস্থান। বাতাসে বেড়েছে ছোট বিষাক্তকণার পরিমাণও। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুসহ সব বয়সী মানুষ।
এ অবস্থার জন্য ইটভাটা,যানবাহনের কালো ধোঁয়াসহ হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে দূষিত বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশকে দায়ী করছে পরিবেশ অধিদফতর। সমাধানে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৮ মাসের ছোট্ট শিশু আয়মান যার মায়ের কোলে হুটোপুটি করার কথা থাকলেও জন্মের পর থেকেই হাসপাতালের বিছানায় লড়াই করছে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য। শুধু আয়মান নয়, ঢাকায় জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশুকেই প্রথম শ্বাস নিচ্ছে বিষাক্ত বায়ুর মধ্যে। ফলাফল জন্মের পরপরই শুরু হচ্ছে এক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা!
শীতে এ শহরের বাতাসে যতটা না কুয়াশা তার থেকেও বেশি থাকে ধুলার আস্তরণ। প্রতিবার শ্বাস নেয়ার সঙ্গে যেন ঢুকছে বিষ। বাঁচার জন্য যে শ্বাস নিতে হয় সে শ্বাসই বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এদিকে বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার শীতকালে কুয়াশায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে পিএম ২.৫ বা ছোট বিষাক্তকণা, যা মানুষের ফুসফুসে ঢুকে বাড়াচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। আর তার প্রথম শিকার হচ্ছে শিশুরাই।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লুনা পারভীন সময় সংবাদকে বলেন, শিশুরা বাইরে গেলে, খেলাধুলা করলে ধুলার কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, এই সমস্যাটা বেশি দেখা যাচ্ছে। বংশগত এই সমস্যার বাইরেও আমরা এ ধরনের রোগী পাচ্ছি, যাদের আগে কখনও শ্বাসকষ্ট ছিল না। নতুন করে তাদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে এবং সহজে ভালো হচ্ছে না।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্র বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার গড় একিউআই ছিল ২০০, যা বিগত ১১ বছরের ডিসেম্বরের গড় ২০৫ এর তুলনায় কম হলেও যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামারুজ্জামান মজুমদার বলেন,
বিগত ৯ বছরে আমরা মাত্র ৫০ দিন নির্মল বায়ু পেয়েছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধুলোবালি শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি শহরের গাছপালা, পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্য এবং সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতাকেও নষ্ট করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এসব ক্ষতির কথা জানা থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নেই তেমন কার্যকর উদ্যোগ।
এদিকে দূষণের তালিকায় বারবার ঢাকা শীর্ষে চলে আসার পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত যানবাহন, ইটভাটার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু কারণকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামারুজ্জামান মজুমদার বলেন,
দূণষের অবস্থা পরিমাপ করার জন্য মেশিনের কোনো প্রয়োজন নেই, খালি চোখেই দেখা যায়। রাস্তায় যখন দেখা যায় একটা ফিটনেসবিহীন গাড়ি কীভাবে ধোঁয়া ছেড়ে যাচ্ছে, এভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ করছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরকে প্রশ্ন করা হলে হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে দূষিত বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করাকে দায়ী করছেন তারা।
পরিবেশ অধিফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, পশ্চিমবাংলা, বিহার থেকে দূষিত বাতাস এখানে প্রবেশ করে এ সময়ে। এটা একটা বড় ব্যাপার, যেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে নীতিমালা করা হচ্ছে কীভাবে বায়ুদূষণ রোধ করা যায়।
সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা, কঠোর পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা। সূত্র: সময়