প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে ধেয়ে আসা যে দুর্দশার কথা কেউ বলে না

প্রযুক্তি ডেস্ক: ডেট্রয়েটের উপকণ্ঠে ট্রেন্টন ফোর্জিং কো। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কটু গন্ধ। সাড়ে ৪ হাজার পাউন্ড ওজনের হাতুড়ি বারবার নেমে আসছে এক টুকরো উত্তপ্ত লাল ইস্পাতের উপর। এত জোরালো সংঘর্ষ সৃষ্টি করছে যা একটি গোটা ভবনকে কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট।

একজন কর্মীর কাজ হলো ২,২০০ ডিগ্রিতে উত্তপ্ত টুকরোটিকে প্রথমে হাতুড়ির নিচে, তারপর কনভেয়র বেল্টের নিচে বসানো। দৈনিক এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটে ৭,০০০ বার। এভাবেই তৈরি হয় ফুয়েল রেইল।

কিন্তু ফুয়েল রেইলের সময় ফুরোতে চলেছে। ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের অন্য শত শত পার্টসের মতো এরাও একটি পার্ট, যার প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকে পড়বে বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে।

অদূর ভবিষ্যতের এই সম্ভাবনার কথা অস্বীকার করছেন না ট্রেন্টন ফোর্জিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেইন মক্সলো। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালে তার দাদার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এই ব্যবসা।

“হয়তো এগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে,” বলেন ৩৩ বছর বয়সী মক্সলো। “কিন্তু এ নিয়ে কি চিন্তা করার দরকার আছে? তা আছে। কিন্তু আমরা ভিন্ন কিছুর পরিকল্পনাও করে রেখেছি।”

পুরো আমেরিকাজুড়ে ট্রেন্টন ফোর্জিংয়ের মতো আরও হাজার হাজার কোম্পানি রয়েছে, যাদের বর্তমান ব্যবসায়িক কৌশলের বিলুপ্তি ঘটতে চলেছে সামনে, যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি দখল করে নেবে বাজার, শো-রুম ও রাস্তাঘাট।

বৈদ্যুতিক গাড়ির আবির্ভাবের ফলে প্রভাবিত হবে আরও লাখ লাখ কর্মীর জীবন, যারা হয়তো বৃহত্তর অটো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত রিপেয়ার শপ, গ্যাস স্টেশন, অয়েল ফিল্ড বা ফার্মে চাকরির মাধ্যমে।

এবং বলাই বাহুল্য, গাড়ি শিল্পের এই বাঁকবদল খুব একটা সহজ হবে না।

গাড়ি নির্মাণ, বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের কাজে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ হয়তো অবশ্যই কাজ হারাবে না, কেননা ডিলারশিপ ও টায়ার শপ চালানোর জন্যও তো দেশব্যাপী বড় সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন। বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজন হবে বিশাল বিশাল ব্যাটারি, এবং সেজন্যও নিশ্চিতভাবেই কাজ জুটবে অনেক মানুষের ভাগ্যে।

তবু, একটি গতানুগতিক গাড়ির ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশনের যেখানে রয়েছে শত শত পার্টস, সেখানে কিছু কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ির পাওয়ারট্রেইনে হয়তো থাকবে মোটে ১৭টি পার্টস। এদিকে রেডিয়েটর, ফুয়েল ট্যাংক বা এক্সহস্ট সিস্টেমও প্রয়োজন হবে না বৈদ্যুতিক গাড়িতে।

একবার রাস্তায় চলা শুরু করলে, একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির কোনো ধরনের স্পার্ক প্লাগ বা তেলেরই প্রয়োজন হবে না। তাই দেশের প্রতিটি প্রান্তে যেসব সার্ভিস স্টেশন রয়েছে, সেগুলোর কাজের পরিধি হয়তো নেমে আসবে কেবলই টায়ার ও ওয়াইন্ডশিল্ড ওয়াইপার পরিবর্তনে।

গতানুগতিক গাড়ি এরপরও রাস্তায় চলবে কয়েক বছর। তাই হয়তো হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়বে না সার্ভিস স্টেশনের সকল কর্মী। কিন্তু গ্যাসোলিন-চালিত গাড়ির গড় আয়ু যেহেতু ১২ বছর, তাই ওইসব গাড়ি নিঃসন্দেহে মানুষের গ্যারেজে থাকবে না বছরের পর বছর।

বৈদ্যুতিক গাড়ির আবির্ভাবের ফলে তেলের প্রয়োজনীয়তা ২০৪০ সাল নাগাদ কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নেমে আসবে ৪৭ লাখ ব্যারেলে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মোট ব্যবহারের ২৬ শতাংশ, এবং জার্মানি ও ব্রাজিল ২০২০ সালে দৈনিক যে পরিমাণ তেল ব্যবহার করত তার সমান। এদিকে গ্যাসোলিন বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ হলো, ইথানলের ব্যবহারও অনেক হ্রাস পাবে।

আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাই — গ্যাসোলিন ইঞ্জিন এসে দখল করেছিল বাষ্প ইঞ্জিনের জায়গা, প্লেন ভ্রমণ কমিয়ে দিয়েছিল ট্রেন ভ্রমণের পরিমাণ, এবং প্লাস্টিক এসে দখল করে নিয়েছিল ইস্পাতের জায়গা। ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একই ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

যে ভবিষ্যতের কথা আমরা বলছি, তা কবে বাস্তবায়িত হবে? সহজ কথায় বলতে গেলে, খুব দ্রুতই। জেনারেল মোটর্স ঘোষণা দিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে তারা কেবল জিরো-এমিশন মডেলই বিক্রি করবে। ফোর্ড মোটর কো-ও বলেছে, তারা আশা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের বৈশ্বিক বিক্রিত গাড়ির ৪০ শতাংশই হবে বৈদ্যুতিক। স্টেলান্টিস এনভি-ও জানাচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ইউরোপে তারা ৭০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশের মতো “লো এমিশন ভেহিকলস” অর্থাৎ বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিড গাড়ি বিক্রি করবে।

জো বাইডেনের প্রশাসনও অটো ইন্ডাস্ট্রির এই পালাবদলকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিছুদিন আগে স্বয়ং বাইডেন বলেছেন, “আমেরিকান অটো ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যত হতে চলেছে বৈদ্যুতিক।”

মজার ব্যাপার হলো, বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। সেখানে বর্তমানে বিক্রিত গাড়ির মাত্র ২ শতাংশ বৈদ্যুতিক। এদিকে ফ্রান্স পরিকল্পনা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন নিষিদ্ধ করার। চীন ও ব্রিটেনও তা করবে ২০৪০ সাল নাগাদ। ভারত জানিয়েছে, তারা নিজেদের সামনে একটি “উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা” নির্ধারণ করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে কেবল বৈদ্যুতিক গাড়িই বিক্রি করার।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স হিসাব করে দেখেছে, অটো ইন্ডাস্ট্রি বিদ্যুৎ খাতে শিফট হলে ইউনিয়নের ৩৫,০০০টি চাকরি হ্রাস পেতে পারে। তারা জানিয়েছে, ইউনিয়ন কর্মীদের সুরক্ষার জন্য তারা বাস্তবসম্মত পথে হাঁটছে। সেই সুরক্ষার মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চাকরি প্রাপ্তি থেকে শুরু করে তুলনামূলক ভালো বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা।

এ ব্যাপারে ইউনিয়নের হেডকোয়ার্টারের গবেষণা পরিচালক জেফ ডোখো বলেন, “এই সব ব্যাপারগুলোকে নিশ্চিত করার জন্য, চীন ও ইউরোপের মতো, আমাদেরও প্রয়োজন বড় ধরনের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট। মাদের মনে হচ্ছে বর্তমান পরিবেশে আমাদের অনেক অপ্রীতিকর শর্তের সঙ্গেই সমঝোতা করে নিতে হচ্ছে।”

ওয়ারেন, মিশিগানের মেয়র জিম ফাউটস জানান, বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং বিনিয়োগ আসছে। ক্রিসলার পরিকল্পনা করছে এ শহরে একটি কারখানা স্থাপন করার, যেখানে জিপ ওয়াগনিয়ারের বৈদ্যুতিক সংস্করণ উৎপাদন করা হবে। এর মাধ্যমে ওই কারখানায় ৬,০০০ চাকরির সুযগ শড়ড়ীশ্তী হবে।

কিন্তু তারপরও, ফাউটস জানান, ওয়ারেনের ১,৩৪,০০০ অধিবাসী ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার মুখে রয়েছে।

“অনেকেই ভয় পাচ্ছে, অটোমেশন ও বৈদ্যুতিক গাড়ি হয়তো তাদের চাকরি কেড়ে নেবে,” ফাউটস বলেন। “আমার মনে হয় যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তারা ঠিক থাকবে।”

কিন্তু এ প্রসঙ্গে স্টেলান্টিসের ৫০ বছর বয়সী ড্যান টার্কের মুখ থেকে বের হয় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। “বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো দারুণ। কেউ না কেউ তো এখনও রয়েছে সেগুলো বানানোর জন্য।”

কিন্তু ম্যাগনা ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেশনের সাবেক অটো পার্ট সাপ্লায়ার আইশেনবার্গ বলেন, নতুন যেসব চাকরির সুযোগ তৈরি হবে, তা চাকরি হারানোদের বিকল্প হয়ে উঠবে না। ট্রানজিস্টর, ক্যাপাসিটর কিংবা হাই-ভোল্টেজ ব্যাটারি প্যাক উৎপাদিত হয় একেবারেই ভিন্নভাবে। সুতরাং আগে যে কর্মী ইঞ্জিন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল, হঠাৎ করে তাকে ব্যাটারি বানাতে বললে সে তা পারবে না।

“বিষয়টা অনেকটা আপেলের সঙ্গে কমলার তুলনা করা,” মন্তব্য করেন আইশেনবার্গ।

কিন্তু তারপরও, নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে অনেক জায়গাতেই। জিএম ও দক্ষিণ কোরিয়া-ভিত্তিক ব্যাটারি প্রস্তুতকারক এলজি এনার্জি সলিউশন এপ্রিলেই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা মেটানোর জন্য টেনেসিতে একটি ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ব্যাটারি কারখানা স্থাপন করবে। এই কারখানায় চাকরি হতে পারে ১,৩০০ কর্মীর।

এরকমই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানেই বৈদ্যুতিক গাড়ি সংশ্লিষ্ট কারখানা স্থাপিত হবে, যা নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

অর্থাৎ অটো ইন্ডাস্ট্রি গতানুগতিক গাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক গাড়িতে স্থানান্তর করলে, সেখানে অনেকের যেমন লাভ হবে, অনেকের ক্ষতিও হবে। মেটাল ফোর্জিংয়ের অবস্থান দ্বিতীয় শ্রেণিতে। এই বার্ষিক ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্যের এই ইন্ডাস্ট্রির এক-চতুর্থাংশই আসে রড, ক্র্যাংকশ্যাফট, গিয়ার ও ড্রাইভ শ্যাফট থেকে। ফলে এই ইন্ডাস্ট্রির যে কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

সামনে টিকে থাকার যে যুদ্ধের আগমন ঘটতে চলেছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই হেরে যাবে, হারিয়ে যাবে অনেকে। তবে কেউ কেউ আবার নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ লড়াইও ঠিকই চালিয়ে যাবে।

সেরকম একটি লড়াকু প্রতিষ্ঠান হলো মিলফোর্ড, মিশিগানের কোয়ালিটি স্টিল প্রোডাক্টস। এই প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট জোসেফ শোয়েগমান জানান, তারা চাকতি-সদৃশ টর্ক কনভার্টার হাবসের পরিবর্তে নতুন এক ধরনের পণ্য তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই চেষ্টায় যদি তারা সফল হয়, তাহলে আর তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির উপর ভরসা করার প্রয়োজন পড়বে না।

৪০ কর্মী বিশিষ্ট ফোর্জিং কোম্পানিটি এখনও চিন্তাভাবনা করছে পাইলারের মতো হ্যান্ড টুল তৈরি করার। এছাড়া তারা ডি-রিংয়ের মতো বর্তমানে বিদ্যমান গাড়ির পার্টসও বানানো অব্যাহত রাখতে চাইছে, যেগুলো গাড়ির ব্যাটারিকে ধরে রাখতে কাজে আসবে।

“আমাদের নতুন নতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করার জন্য আরও বেশি আগ্রাসী হতে হবে,” শোয়েগমান বলেন। “আমরা চাই বৈচিত্র্য দিয়ে টিকে থাকতে।”

সূত্র: ব্লুমবার্গ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত