প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে বিপন্ন ডলফিনের, চার বছরে হালদাতেই মারা গেছে ৩১টি

নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় ডলফিন ‘উতোম’ কিংবা ‘শুশুক’ নামে পরিচিত। এখানকার হালদা, কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীতে আগে নিয়মিতই দেখা যেত ডলফিনের খেলা। তবে নদীর বুকে মনোরম এই খেলা এখন দেখা যাচ্ছে কালেভদ্রে। একের পর এক ডলফিনের মৃত্যু মনে করিয়ে দিচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাকে। তাদের হিসাবে সারাবিশ্বের বিভিন্ন নদীতে এই ‘গেঞ্জেস ডলফিন’ বা গাঙ্গেয় ডলফিন আছে সাকল্যে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০। সর্বাধিক ডলফিন থাকা চট্টগ্রামের হালদা নদীকেই এত দিন সবচেয়ে নিরাপদ আবাসস্থল বলে ধারণা করে আসছিল তারা। কিন্তু তাদের এ ধারণা পাল্টে যাচ্ছে এখন। গত চার বছরে শুধু এই নদীতেই ডলফিন মারা গেছে ৩১টি। জেলেদের জালে আটকা পড়ে হালদায় সর্বশেষ দুটি ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে। গবেষকরা এটিকে বলছেন ‘অশনিসংকেত’। তারা মনে

করছেন, হালদা নদীর অবশিষ্ট ৯৬ ডলফিনও এখন আছে চরম হুমকিতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির জরিপ অনুযায়ী, ২০২০ সালেও এ নদীতে ডলফিন ছিল ১২৭টি।

আইইউসিএনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাকিবুল আমিন বলেন, ‘সারাবিশ্বেই লাল তালিকায় আছে ডলফিন। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও হালদা নদীতে সবচেয়ে বেশি ডলফিন আছে। কিন্তু প্রতিকূল নানা পরিবেশ হুমকিতে ফেলছে ডলফিনের জীবন। হালদা নদীতে মাত্র চার বছরে ৩১ ডলফিনের মৃত্যু আমাদের জন্য অশনিসংকেত।’

হালদা নদীর গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘এখানকার বিভিন্ন নদীতে একের পর এক ডলফিন প্রাণ হারাচ্ছে আঘাতজনিত কারণে। শুধু হালদাতেই গত চার বছরে ৩১টি ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে। সর্বশেষ যে ডলফিনটি মারা গেছে, সেটি জালে আটকা পড়েছিল বলে ধারণা করছি আমরা। ডলফিনের লম্বা ঠোঁটে করাতের মতো দাঁত আছে। সেই দাঁত নদীতে থাকা জালে আটকে যায়। ডলফিন আধাঘণ্টার বেশি আটকে থাকলে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়।’ হালদা থেকে সর্বশেষ মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয় ৪ সেপ্টেম্বর। চার দিন আগে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর একই নদী থেকে আরেকটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছিল। এ নিয়ে মোট ৩১টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে হালদায়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে হালদায় ১৮টি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১০টি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। চলতি বছরের ৬ জুলাই, ৩০ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবর এই নদীতে তিনটি ডলফিনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীতে চলতি বছর দুটি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে।

গাঙ্গেয় প্রজাতির ডলফিনের বিচরণ আছে চট্টগ্রামের হালদা, কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীতে। ২০১৭ সাল থেকে কর্ণফুলী ও হালদা নদীর ডলফিন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন গবেষকরা। ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, হালদা নদীতে ডলফিন ছিল ১৬৭টি। ২০২০ সালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় জরিপ করা হালদায়। তখন ডলফিন পাওয়া যায় ১২৭টি।

অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া জানান, হালদায় এত ডলফিন মারা যাওয়ার কারণ উদ্ঘাটন করতে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ডলফিনের ময়নাতদন্ত করেছেন তারা। এতে তারা নিশ্চিত হন, এই নদীতে বেশিরভাগ ডলফিন মারা যাচ্ছে আঘাতজনিত কারণে। ডলফিন ওজনে অনেক ভারী হলেও এটির শরীরে মাংসপেশি নেই। এটির প্রতিরোধ ক্ষমতাও অত্যন্ত দুর্বল। তাই একটু আঘাত পেলে এটি কাবু হয়ে যায়। শরীরে ধরে পচন। চবিতে ডলফিনকে নিয়ে করা এই ময়নাতদন্ত ছিল বাংলাদেশের প্রথম ঘটনা। এতে ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।

এদিকে, ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করতে এর আগে গবেষণা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, পরিবেশ ও বন বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমিন এবং মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক আয়েশা আক্তারও। কর্ণফুলীর মোহনা থেকে ৪৩ কিলোমিটারকে চারটি জোনে ভাগ করে গবেষণাটি পরিচালনা করেন তারা। এ গবেষণায় তারা উল্লেখ করেন, সারাবিশ্বে খুব বেশি না থাকলেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে আছে কিছু গাঙ্গেয় ডলফিন। সবচেয়ে বেশি ডলফিন আছে হালদায়। একটি পুরুষ গাঙ্গেয় ডলফিন ২ দশমিক ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পুরুষের চেয়ে নারী ডলফিন কিছুটা বড় হয়। এরা দেখতে ধূসর রঙের। নাসিকাসহ মুখটি লম্বাটে ধরনের। পেটের দিকটি গোলাকৃতির। এই প্রজাতির ডলফিন ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে এদের জন্মহার কম। নদীকে ঘিরে নেওয়া নানা উন্নয়ন প্রকল্প ধ্বংস করছে এদের আবাসস্থল।

গবেষকরা বলছেন, নদীতে মাত্রাতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান, মাছ ধরার জাল ও ড্রেজার থাকলে বিপন্ন হয় ডলফিনের প্রাণ। কারণ, নদীর নিম্নাংশে বালুতট, বিভিন্ন উপনদী, খাল এবং অন্য নদীর সঙ্গে সংযোগস্থলেই বেশি বিচরণ করে ডলফিন। হালদায় গত চার বছরে যেসব ডলফিন মারা গেছে, তার ৯০ শতাংশেরই শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। জালে আটকা পড়া ডলফিন আধাঘণ্টার মধ্যে মুক্ত করা না হলে সেটির মৃত্যু হয় বলে জানান হালদা গবেষক মনজুরুল কিবরিয়া। সূত্র: সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত