প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় স্বস্তি, ডেঙ্গুতে অস্বস্তি

নিউজ ডেস্ক: দেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে করোনায় মৃতু্য ও সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা কমছে। শনাক্তের হার নেমে এসেছে ৬ শতাংশে। রাজধানী ঢাকা কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে সাধারণ শয্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ খালি। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ বেড খালি প্রায় ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে দেশে গত এক সপ্তাহে (১০ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর) ২ হাজার ১৮১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬৩ জনসহ চলতি মাসের ১৬ দিনে ৪ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যায়যায়দিন

এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘ দেড় বছরের প্রচেষ্টায় করোনায় স্বস্তি ফিরলেও, ডেঙ্গুতে অস্বস্তি বাড়ছে। ফলে ডেঙ্গুর বিস্তারের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ২০১৯ সালের মতো ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। তখন করোনার মতো ডেঙ্গুতেও মানুষকে নাস্তানাবুদ হতে হবে।

করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা সুবিধা রাজধানীতে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ১৬ সেপ্টেম্বরের হেলথ বুলেটিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যার ৭৫ শতাংশ খালি রয়েছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ বেড খালি রয়েছে ৭২ শতাংশ। সরকারি হাসপাতালের ৫৫ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতালের ৮৬ শতাংশ আইসিইউ ফাঁকা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর ১৭টি সরকারি ও ৩১টি বেসরকারি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল রয়েছে। এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে ৫ হাজার ৫৪০টি সাধারণ শয্যা ও ৮৫৯টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। মোট সাধারণ শয্যার মধ্যে শুক্রবার খালি ছিল ৪ হাজার ১৫৮টি। অপরদিকে ৮৫৯টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৬৩০টি খালি রয়েছে।

এর মধ্যে ১৭টি সরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৩ হাজার ৮৯০টি। এর মধ্যে খালি ২ হাজার ৮০৬টি। আর ৩৮২টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ২১৫টি খালি রয়েছে। অপরদিকে বেসরকারি ৩১টি হাসপাতালে ১ হাজার ৬৫০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে খালি ছিল ১ হাজার ৩৫২টি। এ ছাড়া ৪৭৭টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৪১৫টি আইসিইউ বেড খালি রয়েছে।

শুক্রবার বিভাগীয় হিসাব অনুযায়ী, করোনা রোগীদের সেবায় ঢাকা বিভাগে মোট ৭ হাজার ১৫০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ৫ হাজার ৫৩৯টিই ফাঁকা পড়ে ছিল। এ ছাড়া ৯১৯টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৬৫৫টি রোগী শূন্য ছিল। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৯৬টি সাধারণ বেডের বিপরীতে ৪৫৯টি এবং ২২টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ১৭টি ফাঁকা ছিল। চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ হাজার ২১০টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ২ হাজার ৮৬৯টি ও ১২২টি আইসিইউ’র মধ্যে ৪৩টি ফাঁকা রয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ৯৫০ সাধারণ সিটের মধ্যে ৭০৪টি ও ৫৮টি আইসিইউ’র মধ্যে ৩৮টি বেড রোগী শূন্য রয়েছে। রংপুর বিভাগে ১ হাজার ৪১ সাধারণ শয্যার মধ্যে ৯৪৪টি ও ৪৪টি আইসিইউ’র মধ্যে ৩৯টি ফাঁকা ছিল, খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৬৮৩টি শয্যার মধ্যে ১ হাজার ৪২৯টি ও ৮৬টি আইসিইউ’র মধ্যে ৪৭টি ফাঁকা, বরিশাল বিভাগে ৬৫০ সাধারণ বেডের মধ্যে ৫৫০টি ও ৪১টি আইসিইউ’র মধ্যে ৩৬টি ফাঁকা, সিলেট বিভাগে ৪৩৬টি সাধারণ বেডের মধ্যে ৩৬৭টি ও ২২টি আইসিউি’র মধ্যে ৯টি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে শুক্রবার দেশের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাগুলোয় ১৫ হাজার ৬১৬টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ১২ হাজার ৮৭১টি এবং ১ হাজার ৩১৪টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৪টি শয্যা রোগী শূন্য ছিল।

অন্যদিকে চলতি বছর এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ১৫ হাজার ২২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩২, ফেব্রম্নয়ারিতে ৯, মার্চে ১৩, এপ্রিলে ৩, মে মাসে ৪৩ জন ভর্তি হয়। এরপর থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জুনে ২৭২, জুলাইয়ে ২ হাজার ২৮৬, আগস্টে ৭ হাজার ৬৯৮ এবং চলতি সেপ্টেম্বরের ১৬ দিনে ৪ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ডেঙ্গুতে কোনো রোগীর মৃতু্য হয়নি। তবে জুলাই থেকে রোগী বাড়ায় গত দুই মাসেই ৪৮ জন মারা যায়। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১২, আগস্টে ৩৪ এবং ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ জনসহ মোট ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৭ জনের মৃতু্য হয়েছে। চলতি বছর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে ১৪ হাজার ৮৩১ জন ডেঙ্গু রোগী। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৪৮৩ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। বর্তমানে হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ২৯১ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতু্যর বছরভিত্তিক তথ্য রাখছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এর আগের সব বছরের রেকর্ড ছাড়ায়। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। পরের বছর তা অনেকটা কমে আসায় হাসপাতালগুলো ১ হাজার ৪০৫ জন ডেঙ্গু রোগী পেয়েছিল। তবে চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্তের ঘটনা।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণে স্বস্তি ফেরার মধ্যে ডেঙ্গুতে অস্বস্তি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি তিন ধাপে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি বলতে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো। এজন্য অসংখ্য পেশাদার এন্টমোলোজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত ওয়ার্ড বা উপ-ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর, রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম, জনস্বাস্থ্য দপ্তর ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগে সব কাজ করতে হবে। কোনো এলাকাতেই এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র থাকবে না, এভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোতে হবে। তৃতীয়ত, ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নির্মূল আইন রয়েছে, প্রয়োজনে সে আইন প্রয়োগ করতে হবে। এভাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্প মেয়াদে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলা করা সম্ভব।

এ ছাড়া মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের ধাপের কাজ হবে ডেঙ্গু নির্মূলে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় জাতীয় কর্মকৌশল তৈরি করা। দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থা নিয়ে সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গু নির্মূলে কাজ করতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত