প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: যে হতে পারতো গানের পাখি, আমরা তাকেই বানাতে চাই তোতা পাখি

প্রভাষ আমিন: শিশুদের রুটিনে খেলা নেই, গান নেই, আউট বই পড়ার সুযোগ নেই। শুধু ছুটে চলা। কিসের পেছনে? আমি নিশ্চিত নই। পড়াশোনা? আসলে কি পড়াশোনা, নাকি নিছক রোল নম্বর আর সার্টিফিকেট? আসলে কোনটা সাফল্য, কোনটা ব্যর্থতা, আমি নিশ্চিত নই। তাহলে আমরা কিসের পেছনে ছুটছি, সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছি কিসের রেসে। সাফল্য মানে আসলে কী? আমরাই তো সন্তানদের শৈশব থেকে আনন্দ কেড়ে নিয়ে সেখানে ভর্তি করে দিচ্ছি অনন্ত চাপ। সাফল্য চাই, আরও সাফল্য। বোঝো আর না বোঝো সব মুখস্ত করতে হবে। তারপর পরীক্ষার খাতায় সব উগড়ে দিতে হবে। অমুক কেন তোমার চেয়ে ভালো, তমুক কেন নম্বর বেশি পেলো।

যে হতে পারতো গানের পাখি, আমরা তাকেই বানাতে চাই তোতা পাখি। হাজার হাজার তোতা পাখি কিচির মিচির করছে আমাদের চারপাশে। আমরা বলি, শুধু পড় আর পড়। আমরা জানতে চাই না বা জানাতেও চাই না, আমাদের সন্তান গান শুনতে চায় কিনা, ফুল ভালোবাসে কিনা, প্রকৃতি তাকে টানে কিনা, শীতের সকালে শিশিরে পা ভেজাতে চায় কিনা, বৃষ্টিতে ভিজতে তার কেমন লাগে, গাছপালা-নদীনালার সৌন্দর্য্য আবিষ্কারের আনন্দ সে পেতে চায় কিনা। পরীক্ষায় ভালো করতে হবে, গোল্ডেন জিপিএ ৫ না পাওয়া বিরাট ব্যর্থতা। সুমনের গানের মতো ‘একটু পড়া, অনেক খেলা/গল্প শোনার সন্ধ্যাবেলা’ আর কারও জীবনে আসে না। নীতি-নির্ধারকদের ধন্যবাদ। তারা শিশুদের এই পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি দিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কথায় কথায় আমরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলি বটে, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার এই পরিবর্তন সত্যিই বৈপ্লবিক। ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা। এতোদিন একটি শিশু বোঝার আগেই তার ওপর চেপে বসতো পরীক্ষার চাপ।

নতুন পরিকল্পনায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই থাকছে না। আর দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা হবে না। এতোদিন পঞ্চম শ্রেণিতে পিইসি আর অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি নামে দুটি চাপের পাহাড় ছিলো শিশুদের কাঁধে। সে পাহাড় দুটি সরিয়ে দিলে তারা একটু মাথা উঁচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে। আর দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা হবে অভিন্ন বিষয়ে। সায়েন্স, আর্টস, কমার্সের বিভাজনটা শুরু হবে একাদশ শ্রেণি থেকে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির দুটি পরীক্ষার ভিত্তিতে দেওয়া হবে এইচএসসির ফল। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে। চতুর্থ শ্রেণির পর প্রথম পরীক্ষা শুরু হলে গুরুত্ব বেশি থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপরই। সবমিলিয়ে পরীক্ষায় যেনতেনভাবে ভালো করার চাপের বদলে নিয়মিত ক্লাসরুমের পারফরম্যান্স গুরুত্ব পাবে বেশি।

শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে নিজেদের মতো পড়াশোনা করবে। শিক্ষকরা তাদের মূল্যায়ন করবেন। নতুন পরিকল্পনা অবশ্যই উচ্চাভিলাসী। তবে শিশুদের স্বার্থে এই পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও আছে।যেহেতু শিক্ষকদের মূল্যায়নের গুরুত্বটাই সবচেয়ে বেশি। তাই তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা বাড়ানোটা জরুরি। তারচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষকদের নৈতিক মান বাড়ানো। শিক্ষকদের ধারাবাহিক মূল্যায়নই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, এটা শোনার পর আমি রীতিমত আতঙ্কিত হয়েছি। শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে ক্লাস পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি বা ফেল করিয়ে দেওয়ার উদাহরণ ভুরি ভুরি। এই বিষয়টার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে সবচেয়ে বেশি। প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা, দক্ষতা হয়তো একটা পর্যায় পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। কিন্তু শিক্ষকদের নৈতিকতার মানদণ্ড রক্ষা করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীরা স্কুলে শুধু পাঠ্যবই শিখতে যায় না।
সেখানে তাদের জীবন শেখানো হয়।

তাই শিক্ষকদের কাছ থেকে নৈতিকতা শিখবে, মূল্যবোধ শিখবে। প্রাইভেট-কোচিংয়ের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে হলে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শিশুদের জন্ম নেয় নিষ্পাপ হিসেবে। আমরা তাদের নানা প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেই। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পয়সা দিয়ে কিনে সন্তানের হাতে তুলে দেই। কীভাবে পাশের বন্ধুকে ল্যাং মেরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, আমরা সন্তানদের সেই শিক্ষা দেই। গাইড বই, নোট বই আমরাই কিনে তাদের জাতে তুলে দেই। তারা শিখে যায়, ফল ভালো করতে হলে অমুক শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে হবে। এভাবে ঘরে-বাইরে, স্কুলে শিশুদের অনৈতিকতা শেখাই। তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার বদলে শৈশবেই তা ধ্বংস করে দেই। চ্যালেঞ্জ আছে বলে থেমে থাকা যাবে না। সামনে যতো বাধাই আসুক শিশুদের স্বার্থে সব বাধা পেরিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই আমাদের প্রতিটি সন্তান মানুষের মতো মানুষ হোক। তারা শিক্ষায়, জ্ঞানে, মানবিকতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কেউ কাউকে ল্যাং মেরে এগিয়ে যাবে না। সবাই সবার পাশে থাকবে, একসঙ্গে এগিয়ে যাবে। তাদের জীবনটা যুদ্ধের না হোক, হোক আনন্দের, সৃষ্টিশীলতার। দেশের ভবিষ্যতটা তো তাদেরই হাতে। তাই তাদের পেছনেই আমাদের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

সর্বাধিক পঠিত